কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

এক দশকে মেলেনি সংস্কার, ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ কচুরিপানার দখলে

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ একটা সময়ে যে খেলার মাঠে ছিল ফুটবল, ক্রিকেট ও ভলিবলের উত্তেজনা। সকাল-সন্ধ্যা মানুষের ভিড় লেগে থাকতো। প্রায় এক দশক যাবত সেই মাঠ কচুরিপানার দখলে। ঈদ এলে উপজেলার সবচেয়ে বড় জামাত হতো এখানেই। সরকারি সভা-সেমিনার থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-সব কিছুর প্রাণকেন্দ্র ছিল এই মাঠ। আজ সেই মাঠে আছে পানি, কচুরিপানা আর হাঁটুসমান আগাছা। বছরের ৮ মাস থাকে জলাবদ্ধতা।

ঈদগাহের মিনার ডুবে আছে। মাঠে চরে বেড়ায় গরু-ছাগল। আর মাঠের পাশের সড়কে বসে তরুণরা মোবাইলে গেম খেলে সময় পার করে। এভাবেই বিলীন যাচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা পরিষদের একমাত্র খেলার মাঠটি। উপজেলা পরিষদ থেকে ৩০০ মিটার উত্তরে দুর্গাপুর এলাকায় মাঠটির অবস্থান। একপাশে দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। অন্যপাশে কুমারখালী আদর্শ মহিলা বিদ্যালয় ও আবুল হোসেন তরুণ অডিটোরিয়াম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের কোনো ড্রেন নেই। আশপাশে অপরিকল্পিত স্থাপনা আর পুকুর খননের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে পানির স্বাভাবিক পথ। ফলে প্রতি বর্ষায় মাঠ তলিয়ে যায়। আর পানি নামতে নামতে চলে যায় আরও আট মাস। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের বুকজুড়ে কচুরিপানায় ফুটেছে সাদা ফুল। বড় বড় দূর্বা ঘাস আর আগাছার জঙ্গল। কেউ কেউ ঘাস কাটছে গবাদিপশুর জন্য। মাঠের এক কোণে নানা বয়সি কয়েক জন মানুষ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

এ সময় কুমারখালী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র শ্রাবণ মাহমুদ বলেন, বিকেলে মাঠে খেলার কথা। কিন্তু মাঠে হাঁটু পানি, কচুরিপানা। সেজন্য মোবাইল চালাচ্ছি। আগে এখানে টুর্নামেন্ট হতো। সারাদিন খেলা চলতো। বিগত ৮-১০ বছর ধরে শুধু পানি আর কচুরিপানা, বলছিলেন আরেক কলেজছাত্র শাহরিয়ার জাবিদ। তার আক্ষেপ, খেলার জায়গা নেই। ছেলেরা এখন মোড়ে মোড়ে আড্ডা দেয়। মোবাইলে গেম খেলে। অনেকে মাদকের দিকেও চলে যাচ্ছে। একটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শফি উদ্দিনের কণ্ঠেও একই ক্ষোভ। তিনি বলেন, প্রতি বছর শুনি বরাদ্দ এসেছে, কয়েক গাড়ি বালুও ফেলে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। এমপি, চেয়ারম্যান ও এলাকার নেতাকর্মী কারও নজর নেই এদিকে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস বলেন, বছরে শুধু একবার কোনোমতে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয়। কিন্তু সবসময় খেলার সুযোগ না থাকলে নতুন প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রাখা কঠিন। তিনি আরও বলেন, শুধু খেলাধুলাই নয়, বন্ধ হয়ে গেছে উপজেলার সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতও। বন্ধ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সব আয়োজন।

দুর্গাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক ও সাবেক খেলোয়াড় বসির উদ্দিন বলেন, এ মাঠ থেকে অনেক নামিদামি খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে। তারা জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে খেলেছে। ১৫-২০ বছর আগে খেলাধুলায় মুখরিত থাকত এখানকার ছেলেমেয়েরা। এখন পানির জন্য সবকিছু থমকে গেছে। দ্রুত মাঠটি সংস্কারের দাবি জানান তিনি। কুমারখালী নাগরিক কমিটির সভাপতি আকরাম হোসেন বলেন, এক সময় এই মাঠেই হতো উপজেলা প্রশাসনের সব বড় অনুষ্ঠান। স্থানীয় উদ্যোগে বছরে কয়েকটি ফুটবল-ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হতো। মানুষের ভিড় লেগে থাকতো।

কিন্তু পরিকল্পিত সংস্কারের অভাবে বর্তমানে মাঠটি জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। মাঠের গৌরব ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তার। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, মাঠের বিষয়টি আমরা জানি। এটি কুমারখালীবাসীর আবেগের জায়গা। আগামী অর্থ বছরের বরাদ্দ পেলে খুব দ্রুত সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের কাজ করা হবে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর