বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট, নির্যাতন, অনিয়ম ও সাফল্যের কথা বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন কুষ্টিয়ার সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত। তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অসহায় বহু মানুষের গল্প। তার লেখা সংবাদ পড়ে অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন বিপন্ন মানুষের। কিন্তু সেই সাংবাদিকই আজ নেই। তার মৃত্যুর পর অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার পরিবার। অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা-মা, শিশু সন্তান-কোথায় যাবেন তারা, কীভাবে চলবে সংসার-এই প্রশ্নের উত্তর নেই কারও কাছে।
কারণ, পরিবারের মাথা গোঁজার মতো নিজস্ব কোনো ঘরবাড়ি নেই। জানা যায়, সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে। পরিবারের কারও নিজস্ব জমি বা বাড়ি নেই। গ্রামে যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করে প্রায় ১৩ বছর ধরে শহরের ওই ভাড়া বাসাতেই বসবাস করছিল পরিবারটি।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন দেবাশীষ দত্ত। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন ও দৈনিক আজকের পত্রিকায় কাজ করেছেন। পাশাপাশি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দেবাশীষের কাকি অর্চনা দত্ত বলেন, ‘এই পরিবারে কিছুই নেই। থাকার জায়গাটুকুও নেই। সরকারের কাছে অনুরোধ, আপনারা এই পরিবারের পাশে দাঁড়ান।’ দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘আমার সংসারে দেবাশীষই ছিল মূলধন। সেই সংসার চালাত। প্রতি মাসে আমার ও দেবাশীষের মায়ের প্রায় ১০ হাজার টাকার ওষুধ লাগে।
আমরা দুজনই হৃদরোগে ভুগছি। যে বাসায় থাকি, সেখানে মাসে সাত হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এখন দেবাশীষের মেয়েকে কীভাবে দেখব? তাকে দেখাশোনা করাও আমার জন্য কষ্টকর। এখন আমরা কোথায় যাব, কী করব-কিছুই জানি না। খেয়ে থাকব, নাকি না খেয়ে থাকব, সেটাও জানি না।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই নেই। এই সংসার কীভাবে চলবে, তা দেখার মতো কেউ নেই।
সরকারের কাছে আবেদন, শিশুটিকে নিয়ে যেন আমরা বেঁচে থাকতে পারি, সেই সহযোগিতা করুন।’ ছেলেকে হারিয়ে শোকে প্রায় বাকরুদ্ধ দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরাও। বিলাপ করতে করতে স্বপ্না দত্ত বলেন, ‘আমি কী করে সহ্য করব? আমাদের একটাই কলিজার সন্তান ছিল, সে-ও চলে গেল। আমার আর কেউ নেই। দেবাশীষ, তোর বৃদ্ধ মা-বাবাকে কে দেখবে?’ দেবাশীষ দত্তের দীর্ঘদিনের ক্যামেরাম্যান রুবেল বলেন, ‘দাদা যে অবস্থায় চলে গেলেন, তার পরিবারের এখন কী হবে? সহকর্মী হিসেবে সবার কাছে অনুরোধ, আপনারা এই পরিবারের পাশে যতটুকু পারেন দাঁড়ান।’
দেবাশীষের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও স্টার নিউজের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের কোনো বাড়ি নেই। একেবারে বাস্তহারা অবস্থায় জীবন কাটিয়েছে পরিবারটি। তার উপার্জনের ওপরই সবাই নির্ভরশীল ছিল। তার মৃত্যুতে পরিবারটি একেবারে অতলে পড়ে গেল। সরকার, সাংবাদিক নেতা ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছে দাবি-শিশুটি যাতে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারে এবং পরিবারটি যাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হোক।’
সাংবাদিক সহযোদ্ধা হাসান আলী বলেন, ‘দেবাশীষ সংগ্রামী জীবন পেরিয়ে সাংবাদিকতায় উঠে এসেছিল। তার অকাল মৃত্যু কুষ্টিয়ার সাংবাদিক অঙ্গনে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। একেবারে মাটি থেকে উঠে আসা এই সাংবাদিকের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকার ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই।’ কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বাচ্চু বলেন, ‘প্রয়াত সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের পাশে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
তাদের একটি স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করতে সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রশাসনের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করছি।’ এদিকে, দেবাশীষ দত্তের শিশু কন্যা মহিমা দত্ত ওরফে পাখি কুষ্টিয়ার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। বাবা ও পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে যখন তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে, তখন তার পাশে দাঁড়িয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, ‘মহিমা দত্তের এইচএসসি পর্যন্ত স্কুলের বেতন, পরীক্ষার ফি, বই-খাতা, কলমসহ যাবতীয় খরচ এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বহন করবে।
শুরু থেকেই যেন বাবা-মায়ের অভাবে সে শিক্ষা থেকে পিছিয়ে না পড়ে, সে জন্যই আমরা এই উদ্যোগ নিয়েছি।’ গত ৩ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভারতে যান দেবাশীষ দত্ত। প্রথমে তারা বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা নেন। প্রায় ১৩ দিন পর সোমবার রাতে কোলকাতায় ফেরেন। মঙ্গলবার আত্মীয়স্বজনের জন্য কেনাকাটা শেষে বুধবার তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল। এর মধ্যেই মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে কোলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত নয় বাংলাদেশির মধ্যে ছিলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত।
এ ঘটনায় তার পরিবারের সদস্যদেরও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। দেবাশীষের আকস্মিক মৃত্যুতে একদিকে যেমন শেষ হয়ে গেছে একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন, অন্যদিকে অনিশ্চয়তায় পড়েছে তার রেখে যাওয়া অসুস্থ বাবা-মা ও শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ। এখন তাদের প্রয়োজন একটি নিরাপদ আশ্রয়, আর্থিক সহায়তা এবং শিশুটির শিক্ষার নিশ্চয়তা।









