ময়নাতদন্ত সম্পন্ন
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমীন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ শনিবার দেশে আনা হতে পারে। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মরদেহগুলো গ্রহণ করতে দেবাশীষের শ্যালক ফিরোজ হাসান বুধবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া থেকে কলকাতায় পৌঁছেছেন। এ ছাড়া কলকাতায় থাকা দেবাশীষের আত্মীয় সঞ্চয় ঘোষ ও ভগ্নিপতির ভাই কাঞ্চন নন্দীও মরদেহ দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগষ্ট) সন্ধ্যায় কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেবাশীষ দত্তসহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নয়জনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক) মো. ওমর ফারুক আকন্দ এবং দূতাবাসের কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। স্বজনরা জানান, কলকাতা থেকে চারটি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রায় আড়াই লাখ ভারতীয় রুপি খরচ হওয়ার কথা। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় চার লাখ টাকা।
এই অর্থ বহন করে মরদেহ দেশে আনা পরিবারের জন্য কঠিন হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কলকাতার বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ জানান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে মরদেহগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার সব খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। এদিকে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষ দত্তের ভাড়া বাসায় স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের ভিড় রয়েছে।
প্রিয়জনদের হারানোর শোকে সেখানে চলছে আহাজারি। দেয়ালে টাঙানো বাবা-মায়ের ছবির দিকে অপলক তাকিয়ে আছে দেবাশীষের আট বছর বয়সী মেয়ে মহিমা দত্ত। বাবা-মাকে হারানোর নির্মম বাস্তবতা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি শিশুটি। নিহত সাংবাদিকের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারা। বুধবার রাতে কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি মুফতি আমির হামজা জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের নিয়ে দেবাশীষের বাড়িতে যান।
বৃহস্পতিবার সকালে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন আহমেদও দলীয় নেতাদের নিয়ে পরিবারটির খোঁজ নেন। নিহত চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের অনুরোধে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মরদেহ শ্মশানে বিনা মূল্যে সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন।
এদিকে দেবাশীষ দত্ত ও আফসানা শারমীনের একমাত্র জীবিত সন্তান মহিমা দত্তের এইচএসসি পর্যন্ত পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক রাসেল জানিয়েছেন, মহিমার বেতন, পরীক্ষার ফি, বই-খাতা, কলমসহ শিক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় খরচ প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে। পারিবারিক সূত্র জানায়, দেবাশীষ দত্ত ও তার ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তের মরদেহ হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সৎকার করা হবে।
অন্যদিকে আফসানা শারমীন ও তার বাবা আকরাম হোসেনের মরদেহ ইসলামী রীতি অনুযায়ী জানাজা ও দাফন করা হবে। প্রায় নয় বছর আগে আফসানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ। ধর্মীয় ভিন্নতা তাদের দাম্পত্য জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। দুই সন্তান মহিমা ও স্বর্ণশীষকে ঘিরেই ছিল তাদের সংসার। উল্লেখ্য, মঙ্গলবার গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ১৫ জি মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি ও দুজন ভারতীয় নাগরিক।








