কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

উডল্যান্ড প্লাইউড কারখানাকে পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিশ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের বারখাদা-জুগিয়া আবাসিক এলাকায় অবস্থিত উডল্যান্ড প্লাইউড অ্যান্ড পার্টিক্যাল বোর্ড মিলসের বিরুদ্ধে বায়ুদূষণের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সম্প্রতি কারখানাটি পরিদর্শন করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট ধূলিকণা ও ধোঁয়া আশপাশের বাড়িঘর ও লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি শনাক্ত করেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় সাত কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে কারখানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করেন। এ সময় দেখা যায়, কারখানার ধোঁয়া ৭০ ফুট উঁচু স্টেইনলেস স্টিলের চিমনি ও এক্সজস্ট ফ্যানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট বাষ্পের সঙ্গে ক্ষুদ্র ধূলিকণা মিশে আশপাশের বাড়িঘর ও লোকালয়ে জমা হচ্ছে। এতে বায়ুদূষণ হচ্ছে বলে পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

পরিদর্শনের সময় আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলেন কর্মকর্তারা। তাঁদের বক্তব্যে দূষণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে কারখানা কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

 

নোটিশে বলা হয়েছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া লাইসেন্সের ১, ৪, ১৪ ও ১৭ নম্বর শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তার ব্যাখ্যা সাত কর্মদিবসের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া কারখানার কার্যক্রম বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২-এর ৮(ক) বিধির পরিপন্থি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘনবসতিপূর্ণ জুগিয়া আবাসিক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটির কার্যক্রম চলছে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত কাঠের গুঁড়া, ধূলিকণা ও বয়লারের কালো ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। খোলা জায়গায় রাখা কাঠের গুঁড়া ও ছাই বাতাসে মিশে বাড়িঘর, গাছপালা, ফসল ও আসবাবপত্রে জমা হচ্ছে। এতে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

 

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, কারখানার বর্জ্য আশপাশের ডোবা, নালা ও ড্রেনে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের পথ ধরে খাল ও নদীতে মিশে পানিদূষণের আশঙ্কা তৈরি করছে। দুর্গন্ধযুক্ত পানি কৃষিকাজে ব্যবহারের ফলে ফসল ও কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে বলেও দাবি তাঁদের। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও দূষণের মাত্রা নির্ধারণে পানি, মাটি ও বায়ুর নমুনা পরীক্ষা প্রয়োজন।

 

এদিকে কুষ্টিয়া-ভেড়ামারা সড়কের জুগিয়া এলাকায় কারখানার সামনে কাঠ ও জ্বালানি বোঝাই ট্রাক, নছিমন ও আলমসাধু দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

 

কারখানায় কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁদের অনেকের নিয়োগপত্র নেই। কর্মস্থলে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও নেই। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিদিন বিরতিসহ ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে হয়। কিন্তু অতিরিক্ত কাজের জন্য আইন অনুযায়ী ভাতা দেওয়া হয় না। অনেক শ্রমিককে মাস্ক ছাড়াই কাজ করতে হয় বলেও জানান তাঁরা।

 

শ্রমিকদের এসব অভিযোগের বিষয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক, ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা যাচাই করা জরুরি।

 

জানা গেছে, কারখানাটি আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের দাবিতে এর আগেও স্থানীয় বাসিন্দারা তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছিলেন। অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খানের মাধ্যমে পাঠানো ওই আবেদনের অনুলিপি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল।

 

আবেদনে বলা হয়, জুগিয়া একটি ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা। সেখানে কারখানাটির উৎপাদন কার্যক্রমের কারণে কাঠের গুঁড়া, ধূলিকণা ও বয়লারের কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি ভারী যানবাহন চলাচল ও হর্নের শব্দে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তিতে রয়েছেন। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় কারখানাটি বিসিক শিল্পনগরী অথবা নির্ধারিত কোনো শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের দাবি জানান তাঁরা।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কারখানার ধোঁয়া, কাঠের গুঁড়া ও বর্জ্যের কারণে আশপাশের ২০ হাজারের বেশি পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ও দূষণের বিস্তৃতি নিয়ে কোনো স্বতন্ত্র জরিপ বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার তথ্য পাওয়া যায়নি।

 

স্থানীয়দের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কারখানার অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে পরিবারসহ উচ্ছেদের ভয় দেখানো হয়। এ অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তাঁরা।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিদর্শন ও কারণ দর্শানোর নোটিশের পর কারখানাটির পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু নোটিশ জারি নয়, কারখানার বায়ু ও পানি দূষণের মাত্রা পরীক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ধোঁয়া ও ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় কারখানাটির কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

এলাকাবাসীর দাবি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় কারখানাটির কার্যক্রম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আবাসিক এলাকা থেকে উপযুক্ত শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর