খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই জুলাই ২০২৬, ২:৫৯ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার গড়াই নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বালু অপসারণের কাজ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। উন্মুক্ত দরপত্রে আওয়ামী লীগের এক নেতার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ পাওয়া বালুমহল বর্তমানে বিএনপির এক নেতার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালে গড়াই নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জুগিয়া ও গোপীনাথপুর মৌজার ডাইকে স্তুপ করে রাখা বালু অপসারণের কাজ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মেসার্স মেহেদী এন্টারপ্রাইজ-এর নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কুষ্টিয়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর মো. মহিদুল ইসলাম।
পরে ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সম্পাদিত একটি হলফনামায় মহিদুল ইসলাম বালুমহল পরিচালনা, অফিস-আদালতের কার্যক্রম সম্পাদন, মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষমতা কুষ্টিয়া পৌর বিএনপির বর্তমান সভাপতি মো. আবুল কালাম বিশ্বাস (এ. কে. বিশ্বাস বাবু)-কে অর্পণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১৮ মে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, জেলা পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনার আলোকে মূল ঠিকাদারের পক্ষে আবুল কালাম বিশ্বাস জুগিয়া মৌজার ডাইক-১-এ স্তুপ করে রাখা প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ঘনমিটার বালু অপসারণের কাজ পরিচালনা করতে পারবেন। একই সঙ্গে কাজের মেয়াদ ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
তবে সরকারি চিঠিতে আবুল কালাম বিশ্বাসকে নতুন ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে মূল ঠিকাদারের পক্ষে কাজ পরিচালনার অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে আবুল কালাম বিশ্বাস বলেন, ঘাটের বিষয়ে আমরা হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। আদালতের নির্দেশনা ও সরকারি আইনজীবীর মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমার নামেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতার কাছ থেকে ঘাট কীভাবে তার নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা অনেক আগেই ঘাটটি কিনেছি। স্ট্যাম্পকৃত দলিলসহ সব বৈধ কাগজপত্র আমাদের কাছে আছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগেই ঘাটটি কেনা হয়েছে।
মহিদুল ইসলামের সঙ্গে অংশীদারিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঘাটের সব অর্থ আমরা পরিশোধ করেছি। এতে আমার পাশাপাশি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও আরও কয়েকজনের অংশ রয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মহিদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, এ বিষয়ে জেলা বিএনপির কিছু জানা নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু করে থাকলে তার দায়ভার তার নিজের। এর সঙ্গে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই। আমরা এ ধরনের কাজ সমর্থনও করি না।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুল রহমান বলেন, প্রচলিত বিধিমালা ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বালুমহলটি এ. কে. বিশ্বাস বাবুর নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বালু অপসারণ না হলে বিধি অনুযায়ী বালুমহল বাজেয়াপ্ত করা হবে। এদিকে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের এক নেতার নামে বরাদ্দ পাওয়া বালুমহল বিএনপির এক নেতার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়ায় অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রশ্ন তুলছেন।
সামাজিক মাধ্যমে এ নিয়ে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ প্রচার করা হচ্ছে। তবে বালুমহলের অর্থ ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, হত্যার পরিকল্পনা বা অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের যেসব দাবি করা হচ্ছে, সেসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি পুরো বিষয়টি এখন জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও বক্তব্য বা নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য