খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:৪৩ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত কুষ্টিয়া জেলা কেবল একটি প্রশাসনিক ভূখণ্ড নয়, এটি যেন এদেশের হৃদস্পন্দন। গড়াই আর পদ্মার পলিমাটিতে সিক্ত এই জনপদকে অবলীলায় বলা হয় বাংলাদেশের ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’। যে মাটির বাতাসে লালন সাঁইয়ের একতারার অমর বাণী ভাসে, যেখানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়ে নোবেলজয়ী সৃষ্টির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন, সেই মাটির মহিমা অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে আলাদা হবে—এটাই স্বাভাবিক। আধ্যাত্মিক দর্শন, কালজয়ী সাহিত্য, আধুনিক উচ্চশিক্ষা, ঐতিহ্যবাহী শিল্প আর জিভে জল আনা খাবারের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে এই চারণভূমিতে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে কুষ্টিয়া এক অনন্য ইতিহাস রচনা করে। ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের সীমান্তবর্তী শান্ত-সবুজ প্রান্তর শান্তিডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
শুরুতে ইসলামী শাসনতন্ত্র ও ধর্মতত্ত্বের ওপর জোর দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, সময়ের বিবর্তনে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই চিরসবুজ ক্যাম্পাসে ৮টি সুবিশাল অনুষদের অধীনে ৩৬টি সক্রিয় বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। ধর্মতত্ত্ব ও ইসলামী আইনের পাশাপাশি এখানে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, ব্যবসায় প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞান, আইন এবং মানবিক অনুষদের মতো আধুনিক বিষয়গুলোতে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় মগ্ন রয়েছেন। ১৭৫ একরের এই নয়নাভিরাম ক্যাম্পাসটি পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জ্ঞানালোক ছড়ানোর প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।
কুষ্টিয়াকে কেন সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয়, তার উত্তর লুকিয়ে আছে এই শহরের অলিতে-গলিতে। এই জেলাটি যুগ যুগ ধরে লালন করে আসছে মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা ও লোকজ সংস্কৃতিকে।
লালন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু:
ছেউড়িয়ার বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়া কেবল কুষ্টিয়ার নয়, পুরো পৃথিবীর মানবতাবাদী ও বাউল দর্শনের মূল কেন্দ্র। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের জয়গান গাওয়া এই আধ্যাত্মিক ভূমি আজও হাজার হাজার মানুষকে টানে। প্রতি বছর দোলপূর্ণিমায় এবং লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে এখানে বসে সাধুসঙ্গের মহাসম্মেলন, যেখানে একতারার টানে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষ এসে আত্মিক শান্তি খোঁজেন।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও লোকনাট্য:
রাজধানী ঢাকার বাইরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দ্বিতীয় বৃহত্তম ও সবচেয়ে আধুনিক শাখাটি গড়ে উঠেছে এই কুষ্টিয়াতেই। এছাড়া গ্রামীণ লোকনাট্য, পালাগান এবং ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্যের উর্বর ক্ষেত্র এটি। নাট্যচার্য সেলিম আল দীনসহ বহু নাট্যজন এই মাটির পুতুলনাট্য ও লোকজ আঙ্গিক থেকে উপাদান নিয়ে তাঁদের কালজয়ী নাট্যদর্শন সাজিয়েছেন।
কুষ্টিয়ার মানুষ যেমন সংস্কৃতিমনা, তেমনই কর্মঠ। এই জেলার কুমারখালী, ভেড়ামারা এবং কুষ্টিয়া সদর পৌরসভা এলাকায় গড়ে উঠেছে সুপরিকল্পিত বিসিক শিল্পনগরী।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর তাঁতশিল্প বা খদ্দরের কাপড়ের নাম শোনেননি এমন বাঙালি মেলা ভার। এখানকার সুতি ও সিল্কের চাদর, লুঙ্গি ও শাড়ি সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়। এছাড়া এই অঞ্চলে রয়েছে দেশের অন্যতম প্রধান চিনিকল, আধুনিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং বড় বড় রাইস মিল বা চাল কল, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বিশাল অবদান রাখছে। ভেড়ামারার তামাক প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন মাঝারি ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার জোগান দিয়ে চলেছে।
কুষ্টিয়ার মাটি যেন গুণী মানুষ তৈরির এক অক্ষয় কারখানা। এই জেলাটি এমন কিছু মানুষের জন্ম দিয়েছে বা কর্মক্ষেত্র হিসেবে আগলে রেখেছে, যাঁরা বাঙালি সমাজকে পথ দেখিয়েছেন:
ফকির লালন সাঁইজী:
মানবধর্মের প্রবক্তা, বাউল গানের পথপ্রদর্শক এবং দার্শনিক, যাঁর গান ও বাণী বিশ্বজুড়ে আজও গবেষণার বিষয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:
যদিও তাঁর জন্ম কলকাতায়, কিন্তু তাঁর জমিদারি পরিচালনার সূত্রে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি জীবনের এক দীর্ঘ ও সোনালী সময় কাটিয়েছেন। এখানেই বসে তিনি তাঁর ‘সোনার তরী’, ‘খেয়া’ এবং নোবেলজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’র একটি বড় অংশ রচনা করেছিলেন।
মীর মশাররফ হোসেন:
বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ এবং কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষাদসিন্ধু’র রচয়িতা। কুমারখালীর লাহিনীপাড়ায় তাঁর বাস্তুভিটা আজও তাঁর স্মৃতি বহন করছে।
কাঙাল হরিনাথ মজুমদার:
বাংলার প্রথম দিককার নির্ভীক সাংবাদিক, যিনি তাঁর ‘গ্রাম বার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর জমিদার ও ব্রিটিশদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরেছিলেন।
অন্যান্য কীর্তিমান:
নাট্যজগতের কিংবদন্তি নাট্যকার সেলিম আল দীন, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর সংগঠক এম এ ওয়াদুদ এবং আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের অমর গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি”-র কালজয়ী রচয়িতা আবদুল গফফার চৌধুরী—তাঁদের সবার জীবন ও কর্মের সাথে কুষ্টিয়ার নাম জড়িয়ে আছে গভীর আবেগে।
পর্যটক এবং ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য কুষ্টিয়া এক পরম তৃপ্তির জায়গা। এখানকার প্রতিটি দর্শনীয় স্থান একেকটি ঐতিহাসিক দলিল:
শিলাইদহ কুঠিবাড়ি:
কুমারখালী উপজেলায় অবস্থিত এই তিন তলা পিরামিড আকৃতির ভবনটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য জমিদার বাড়ি। ছায়া সুনিবিড় এই চত্বরে কবির ব্যবহৃত বোট ‘পদ্মা’, তাঁর পালকি, লেখার টেবিল ও দুর্লভ সব আলোকচিত্র দেখতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসেন।
ছেউড়িয়ার লালন মাজার:
ফকির লালন শাহের পবিত্র সমাধি ও আখড়া কমপ্লেক্স, যেখানে এলে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি মেলে।
গড়াই নদী ও চাপড়া ব্রিজ:
কুষ্টিয়া শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে গড়াই নদী। এই নদীর ওপর নির্মিত চাপড়া ব্রিজ এবং নদীর তীরের শান্ত পরিবেশ বিকেলে সময় কাটানোর জন্য স্থানীয় ও পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় স্থান।
কাঙাল হরিনাথ প্রেস ও পত্রিকা ভবন:
কুমারখালীতে অবস্থিত এই স্থানটি বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এখানেই রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ‘এম এন প্রেস’ বা ছাপাখানা, যা দিয়ে কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকা ছাপাতেন।
হেমায়েতপুর মাদ্রাসা, মসজিদ ও কুষ্টিয়া জাদুঘর:
জেলার প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সুলতানি-মুঘল আমলের স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে এখানকার পুরানো মসজিদগুলো। আর কুষ্টিয়া কালেক্টরেট ভবনের কাছে অবস্থিত জাদুঘরটি জেলার হাজার বছরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভাণ্ডার।
কুষ্টিয়া ভ্রমণ কখনোই সম্পূর্ণ হবে না যদি না আপনি এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নেন। এখানকার মিষ্টি আর খাবারের সুখ্যাতি দেশজোড়া:
ছেউড়িয়ার ছানার সন্দেশ ও কুলফি:
কুষ্টিয়ার বিখ্যাত ছানার সন্দেশ এবং খাঁটি দুধের মালাই দিয়ে তৈরি কুলফি আইসক্রিম মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়। এর স্বাদ অতুলনীয়।
কুমারখালীর তিলের খাজা:
মুচমুচে আর তিলের সুবাসে ভরা কুমারখালীর তিলের খাজা এদেশের মিষ্টান্নের মধ্যে অন্যতম সেরা একটি ঐতিহ্য।
দই ও রসমালাই:
কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানে পাওয়া যায় খাঁটি মহিষের দুধের দই এবং ছোট ছোট রসগোল্লার তৈরি মালাই।
শীতের খেজুর রস ও খাঁটি গুড়:
শীতকালে কুষ্টিয়ার গ্রামগুলোতে পাওয়া যায় গাছ থেকে পাড়া তাজা খেজুরের রস এবং সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি সুগন্ধি পাটালি ও ঝোলা গুড়, যা দিয়ে তৈরি তালের পিঠা ও ভাপা পিঠার স্বাদ আজীবন মনে রাখার মতো।

কুষ্টিয়া জেলা আসলে কেবল ইট-পাথরের শহর বা কিছু উপজেলার সমষ্টি নয়; এটি হলো মানুষের আত্মার নিঃশব্দ সুর, মেহনতি মানুষের ঘাম আর হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত স্মারক। বাউলের একতারা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাব—সবকিছুকে একসাথে বুকে আগলে রাখা কুষ্টিয়া তাই প্রতিটি বাঙালির কাছে এক পরম অহংকার ও ভালোবাসার নাম।
মন্তব্য