খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:১৩ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর জেলা হলো কুষ্টিয়া। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি এই জনপদ বাণিজ্যিকভাবেও দীর্ঘকাল ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। ভৌগোলিক অবস্থান, নদীবন্দরের সুবিধা এবং ব্রিটিশ আমল থেকেই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারের কারণে কুষ্টিয়া ধীরে ধীরে একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প থেকে শুরু করে ভারী শিল্প এবং বৃহৎ চালের মোকামের কল্যাণে কুষ্টিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে বহুমুখী রূপ লাভ করেছে।

কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের ইতিহাস বেশ প্রাচীন ও বর্ণাঢ্য। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গড়াই নদীর অববাহিকা এবং ১৮৬০ সালের দিকে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের প্রবর্তনের ফলে কুষ্টিয়ার বাণিজ্যে অভূতপূর্ব গতি আসে। সে সময় পাট বা স্থানীয় ভাষায় ‘কোশ্টা’ উৎপাদনের জন্য কুষ্টিয়া বিশেষভাবে পরিচিত ছিল, যা থেকে পরবর্তীতে ‘কুষ্টিয়া’ নামের উৎপত্তি বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
বৃটিশ আমলে গড়াই নদীর তীরবর্তী বড় বাজার এবং জগতি রেলওয়ে স্টেশনের কল্যাণে কলকাতা ও অন্যান্য অঞ্চলের সাথে সরাসরি জলপথ ও রেলপথের সংযোগ স্থাপিত হয়। এই বাণিজ্যিক অনুকূল পরিবেশের সুযোগ নিয়ে উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুতে কুষ্টিয়ায় গড়ে ওঠে বিখ্যাত ‘রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি’ এবং পরবর্তীতে বৃহৎ ‘মোহিনী মিলস’-এর মতো ঐতিহাসিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এই শিল্পগুলো কুষ্টিয়াকে তৎকালীন বাংলার অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তর করেছিল।
বর্তমানে কুষ্টিয়ার অর্থনীতি মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্প, প্রস্তুতকারক শিল্প এবং পাইকারি ব্যবসার ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। জেলার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকাটি বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহত্তম চালের উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র বা ‘মোকাম’ হিসেবে দেশজোড়া পরিচিত। এখানে শত শত অটোমেটিক ও হাসকিং রাইস মিল গড়ে উঠেছে। কুষ্টিয়ার চালের বাজার দেশের মোট চালের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক বোঝাই চাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়, যা জাতীয় খাদ্য অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে।
ভারী ও মাঝারি শিল্প খাতের দিক থেকেও কুষ্টিয়া বেশ এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (BRB Cable Industries) বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক তার ও কেবল উৎপাদনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি, যা আন্তর্জাতিক মানে পণ্য উৎপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করছে। এছাড়া বিভিন্ন লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এই খাতের পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের জন্য দেশজুড়ে খ্যাত। এখানকার কুটির শিল্প ও তাঁতশিল্পে উৎপাদিত লুঙ্গি, গামছা, থ্রিপিস এবং জামদানি শাড়ি দেশের স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাইকারিভাবে বিক্রি হয়। শত শত তাঁতি পরিবারের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এই খাত কুষ্টিয়ার গ্রামীণ অর্থনীতিতে সচল ভূমিকা রাখছে।
কুষ্টিয়ার মাটি ও আবহাওয়া অর্থকরী ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার উৎপাদিত তামাক দেশের বড় বড় তামাক কোম্পানির কাঁচামালের প্রধান জোগানদাতা। এছাড়া জেলার উৎপাদিত পান এবং মধুপুর কলার হাটের কলা দেশজুড়ে সমাদৃত। প্রতিদিন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন হাট থেকে ট্রাকে করে কলা ও পান দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় পাঠানো হয়।
কুষ্টিয়া জেলার অভ্যন্তরীণ ও পাইকারি ব্যবসার মূল প্রাণকেন্দ্র হলো শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বড় বাজার। গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এনএস রোড (NS Road) কেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো জেলার অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মূল স্নায়ু। এছাড়া পোড়াদহ হাট গবাদিপশু ও পাইকারি পণ্যের বাণিজ্যের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী হাট হিসেবে পরিচিত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর ফলে কুষ্টিয়া থেকে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের সাথে দূরপাল্লার যোগাযোগ সহজতর হয়েছে। পূর্বে যমুনা সেতু ঘুরে বা দীর্ঘ ফেরি পারাপারের ভোগান্তির কারণে পণ্য পরিবহনে যে সময় ও আর্থিক ক্ষতি হতো, বর্তমানে তা অনেকাংশে লাঘব হয়েছে। এর ফলে খাজানগরের চাল ব্যবসায়ীরা, কলার পাইকাররা এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদকরা একই দিনে তাদের পণ্য ঢাকা বা দক্ষিণাঞ্চলের বড় বাজারে পৌঁছে দিতে পারছেন। পরিবহন ব্যয় ও সময় হ্রাসের ফলে কুষ্টিয়ার সামগ্রিক বাণিজ্য এখন বহুগুণ সম্প্রসারিত হওয়ার পথে।
কুষ্টিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উদ্যোগ ও সম্ভাবনার কথা আলোচিত হচ্ছে:
প্রশ্ন ১: কুষ্টিয়ার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি কী কী?
উত্তর: কৃষি উৎপাদন, খাজানগরের চাল শিল্প, তাঁতবস্ত্র, ক্যাবল ম্যানুফ্যাকচারিং এবং পাইকারি ব্যবসা কুষ্টিয়ার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
প্রশ্ন ২: কুষ্টিয়ার কোন এলাকা চালের মোকামের জন্য বিখ্যাত?
উত্তর: কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগর এলাকাটি দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম হিসেবে পরিচিত।
প্রশ্ন ৩: কুষ্টিয়ার প্রধান পাইকারি বাণিজ্যিক কেন্দ্র কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: কুষ্টিয়া শহরের বড় বাজার এবং এনএস রোড (NS Road) এলাকাটি জেলার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
প্রশ্ন ৪: কুষ্টিয়ার তাঁতশিল্পের জন্য কোন উপজেলা সবচেয়ে বেশি পরিচিত?
উত্তর: কুমারখালী উপজেলা কুষ্টিয়ার তাঁতশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র।
প্রশ্ন ৫: পদ্মা সেতু চালুর পর কুষ্টিয়ার ব্যবসায় কীভাবে প্রভাব পড়েছে?
উত্তর: পদ্মা সেতু চালুর ফলে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাথে কুষ্টিয়ার পণ্য পরিবহন সময় ও খরচের দিক থেকে অনেক সাশ্রয়ী হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষিপণ্য ও চালের বাজারকে গতিশীল করেছে।
মন্তব্য