কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

এমপি আমির হামজার হলফনামায় অসংগতির অভিযোগ, তদন্ত চেয়ে ইসিতে আবেদন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজার নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে ১৪ ধরনের অসংগতি এবং তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছেন কুষ্টিয়া সদর আসনের ভোটার সিরাজুল ইসলাম। তিনি সদর উপজেলার পশ্চিম আব্দালপুর গ্রামের মরহুম আলী হোসেনের ছেলে। 

 

এব্যাপারে সিরাজুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের কাছে লিখিত আবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এতে ব্যাংক হিসাবে জমা অর্থ, আয়ের উৎস, নগদ টাকা, জমি, বাড়ি, স্ত্রীর সম্পদ, গাড়ি, পারিবারিক ব্যয় এবং নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

 

আবেদনকারী সিরাজুল ইসলামের দাবি, ২০২৫ সালের ৩০ জুন আমির হামজার আয়কর রিটার্নে ব্যাংক হিসাবে কোনো টাকা না থাকার তথ্য দেওয়া হলেও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির কুষ্টিয়া শাখায় তাঁর একটি হিসাবে ৬৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ টাকা জমা ছিল। অথচ নির্বাচনী হলফনামায় ওই ব্যাংকের নাম ও হিসাব নম্বরও উল্লেখ করা হয়নি। এটিকে তথ্য গোপনের অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেছেন সিরাজুল ইসলাম। এমপি আমির হামজার আয়ের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। 

 

এদিকে আবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর আদ-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সম্মানী পান বলে নিজের বক্তব্যে জানিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে প্রতিবার তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা সম্মানী পাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

সিরাজুল ইসলামের দাবি, এসব আয় ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে এসব আয়ের উল্লেখ নেই। আয়কর রিটার্নে আমির হামজার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ৬১ হাজার টাকা। এর পুরোটাই হামজা এন্টারপ্রাইজের কাপড় ও বইয়ের ব্যবসা থেকে এসেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

 

নগদ অর্থের হিসাবেও দুই নথিতে বড় ধরনের পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচনী হলফনামায় আমির হামজার নগদ অর্থের পরিমাণ ২ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আয়কর রিটার্নে দেখানো হয়েছে ৩৮ লাখ ৪৫ হাজার ১৭০ টাকা। দুই হিসাবের পার্থক্য ৩৬ লাখ টাকা।

 

স্ত্রী তামান্না সুলতানার সম্পদের বিবরণ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন আবেদনকারী। তাঁর দাবি, নির্বাচনী হলফনামায় স্ত্রীর আয়কর রিটার্নের তথ্য যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি। হলফনামায় স্ত্রীর কৃষিজমির পরিমাণ ১২ কাঠা বা ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মূল্য দুই লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু স্ত্রীর আয়কর রিটার্নে ১২০ শতাংশ জমি এবং এর মূল্য ১৭ লাখ টাকা উল্লেখ রয়েছে। এতে জমির পরিমাণে প্রায় ১০০ শতাংশ এবং মূল্যে ১৫ লাখ টাকার পার্থক্য রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার জীবননগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত একটি দলিলের মাধ্যমে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ জমি কেনার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ৬৪৯৮/২০২৫ নম্বর দলিল অনুযায়ী, জমিটির মূল্য ছয় লাখ টাকা। এর মধ্যে স্ত্রীর অংশের মূল্য ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ টাকা। আবেদনকারীর অভিযোগ, এ জমির তথ্যও হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি।

 

কুষ্টিয়া শহরের রাহিনী মৌজায় আমির হামজার নামে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ জমি থাকার তথ্যও আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৭৭৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে জমিটি তাঁর নামে নিবন্ধিত হয়। আবেদনকারীর হিসাবে, জমিটির বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ৬০ লাখ টাকা। তবে নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে এ সম্পত্তির উল্লেখ নেই বলে দাবি করা হয়েছে।

 

বাড়িভাড়ার আয় নিয়েও অসংগতি থাকার অভিযোগ করেছেন সিরাজুল ইসলাম। তাঁর দাবি, নির্বাচনী হলফনামায় আমির হামজার স্ত্রীর বাড়িভাড়া বাবদ বার্ষিক আয় এক লাখ ২০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর কারও আয়কর রিটার্নে এ আয়ের উল্লেখ নেই। বাড়িটি যৌথ মালিকানাধীন হলেও বিদ্যুৎ বিল ও হোল্ডিং ট্যাক্স আমির হামজার নামে রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

গাড়ির তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। আবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৯-১৭৫৭ নম্বরের একটি গাড়ি আমির হামজার ব্যবহারে রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি গাড়িটি হস্তান্তর করা হয়। নির্বাচনী হলফনামায় গাড়িটির মূল্য ২৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেখানো হলেও আয়কর রিটার্নে এর তথ্য উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

 

নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবেও নির্ধারিত সীমা অতিক্রমের অভিযোগ আনা হয়েছে। আবেদনকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নির্বাচনী ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৪ লাখ টাকা। এর বাইরে ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব থেকে আরও ৩৮ লাখ টাকা নগদ উত্তোলন করা হয়। সব মিলিয়ে নির্বাচনী ব্যয়ের পরিমাণ ৭২ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন তিনি।

পারিবারিক ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আবেদনকারী। নির্বাচনী হলফনামায় আমির হামজার বার্ষিক পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬০ টাকা। তবে গাড়িচালকের বেতন, ইউটিলিটি বিল ও দুই সন্তানের শিক্ষাব্যয় এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তাঁর। হলফনামায় সন্তানদের পড়াশোনার কথা উল্লেখ থাকলেও আয়কর রিটার্নে শিক্ষাব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে।

 

এ ছাড়া স্ত্রী তামান্না সুলতানার সঙ্গে যৌথ মালিকানাধীন পাঁচতলা ভবন ও জমির সম্মিলিত মূল্য ১ কোটি ৬৮ লাখ ৭৩ হাজার ১৮৩ টাকা দেখানোর বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এ মূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভবনটির তথ্য স্ত্রীর আয়কর রিটার্নেও উল্লেখ করা হয়নি।

 

স্বর্ণের হিসাবেও পার্থক্যের অভিযোগ রয়েছে। আয়কর রিটার্নে ১১৬ দশমিক ৬৪ গ্রাম বা প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণের উল্লেখ থাকলেও নির্বাচনী হলফনামায় তা দেখানো হয়নি বলে আবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া হলফনামার ৩(ক) ও ৩(গ) নম্বর ক্রমিকের তথ্যের মধ্যেও অসংগতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সিরাজুল ইসলাম।

 

আবেদনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১২(৩খ) ও ৯১(ক) ধারা উল্লেখ করে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। আবেদনকারীর বক্তব্য, প্রার্থীর সম্পদ, আয়, দায় ও আয়ের উৎস সম্পর্কে হলফনামায় সঠিক তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক। কোনো নির্বাচিত প্রার্থীর হলফনামা বা আয়-ব্যয়ের বিবরণীতে অসংগতি কিংবা মিথ্যা তথ্যের অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে।

 

অভিযোগ যাচাইয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল, বাংলাদেশ ব্যাংক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, যানবাহন নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং ভূমি ও নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পরীক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন আবেদনকারী।

 

আবেদনের সঙ্গে আমির হামজার নির্বাচনী হলফনামা, আয়কর রিটার্ন, তাঁর স্ত্রী তামান্না সুলতানার টিআইএন সনদ ও আয়কর রিটার্ন, নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী, গাড়ির নিবন্ধন ও হস্তান্তরসংক্রান্ত দলিলসহ বিভিন্ন নথি জমা দেওয়া হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সিরাজুল ইসলাম আবেদনে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানি এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা ও নির্বাচন বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

 

এ বিষয়ে কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা বলেন, আমি মিটিংয়ে আছি, পরে ফোন করছি।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর