কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ভাটার কিলন ভাঙে, বন্ধ হয় না অবৈধ কার্যক্রম

কুষ্টিয়ায় ১৫৫ অবৈধ ইটভাটা

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, ভাঙা হচ্ছে কিলন ও চিমনি। জরিমানা করা হচ্ছে, বন্ধ করা হচ্ছে ভাটার কার্যক্রম। কিন্তু এসব পদক্ষেপেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না অবৈধ ইটভাটা। অভিযান শেষে ভেঙে দেওয়া স্থাপনাগুলো আবারও নির্মাণ করে কার্যক্রম শুরুর অভিযোগ উঠেছে। জেলার ছয়টি উপজেলায় ১৫৫টি অবৈধ ইটভাটা থাকার তথ্য সামনে আসায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ভূমিকা ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কীর্তিনগর-ইমানপুর এলাকায় মেসার্স ফাইভ স্টার ব্রিকস নামের একটি অবৈধ ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে কিলন ও চিমনি সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এক্সকাভেটর দিয়ে ভাটাটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় কার্যক্রম। পাশাপাশি আরো ৩টি ইটভাটা থাকলেও রয়েছে বহাল তবিয়তে। চলতি ইটভাটা মৌসুমে এটি অধিদপ্তরের চতুর্থ অভিযান। 

 

তবে একটি ভাটার স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কি অবৈধ ইটভাটার বিস্তার ঠেকানো সম্ভব? জেলায় যেখানে বৈধ ইটভাটার তুলনায় অবৈধ ভাটার সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি, সেখানে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় বৈধ ইটভাটা রয়েছে মাত্র ১৭টি। বিপরীতে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ১৫৫টি। এর মধ্যে কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় ২৮টি এবং মিরপুর উপজেলায় ৩৫টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। অথচ এ দুই উপজেলায় একটিও বৈধ ইটভাটা নেই।

 

এত বিপুলসংখ্যক অবৈধ ইটভাটা কীভাবে বছরের পর বছর পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অভিযান চালিয়ে ভাটা ভেঙে দেওয়ার পরও অনেক মালিক একই স্থানে পুনরায় স্থাপনা নির্মাণ করে কার্যক্রম শুরু করছেন। ফলে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হচ্ছে না।

 

পরিবেশ ও কৃষিজমির ওপরও পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে বাড়ছে বায়ুদূষণ। অন্যদিকে আবাদি জমির মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহের কারণে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ ও আশপাশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর যেসব অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই পরে পুনর্র্নিমাণ করা হয়েছে। এ তথ্য সামনে আসায় অভিযান-পরবর্তী নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ভাটা ভেঙে দেওয়ার পর সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

একই মালিক বারবার আইন অমান্য করে ভাটা চালু করলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? পুনর্নির্মিত ভাটাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না? শুধু স্থাপনা ভেঙে দেওয়ার মধ্যে অভিযান সীমাবদ্ধ থাকলে অবৈধ ভাটার বিস্তার ঠেকানো কতটা সম্ভব? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন স্থানীয়রা।

 

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর, কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, “যেসব ইটভাটা আমরা ভেঙে দিয়ে আসছি, সেগুলো পুনরায় নির্মাণ করা হলে আবারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলায় এত বিপুলসংখ্যক অবৈধ ইটভাটা রয়েছে। সেগুলোকে আইনের আওতায় এনে বন্ধ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।”

 

তবে পরিকল্পনার পাশাপাশি কার্যকর বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে, তা নিয়েই মূল প্রশ্ন। অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা যেখানে ১৫৫, সেখানে চলতি মৌসুমে চারটি অভিযান কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

 

মঙ্গলবারের অভিযানে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকিউল আলম। প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কুষ্টিয়া জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক। প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী পরিচালক শোয়াইব মোহাম্মদ শোয়েব। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, এসআরবি-১২ ও জেলা আনসার ব্যাটালিয়নের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

 

অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চালানো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও তা যেন সাময়িক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে দাবি উঠেছে। পুনর্র্নিমাণ ঠেকানো, নিয়মিত নজরদারি, আইন অমান্যকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

অন্যথায় কিলন ও চিমনি ভাঙার অভিযান চললেও অবৈধ ইটভাটার বিস্তার থামানো কঠিন হয়ে পড়বে। ১৫৫টি অবৈধ ইটভাটার অস্তিত্বই বলে দিচ্ছে, কুষ্টিয়ায় পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কার্যকর ব্যবস্থা।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর