কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কোথাও উন্নয়নের ছড়াছড়ি-কোথাও বেহাল রাস্তা

৩-৫ শতাংশ কমিশন ছাড়া প্রকল্প বরাদ্দ নয়

 

 

দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন ঘিরে গুরুতর অনিয়ম এবং ‘কমিশন বাণিজ্যের’ অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন না দিলে প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বিরুদ্ধে কমিশন ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্পের বরাদ্দ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট পিআইও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অভিযোগ ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে সৌর বিদ্যুৎ, সোলারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন অবকাঠামো ও জনসেবামূলক উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সব ইউনিয়নে সমানভাবে কাজের দৃশ্যমানতা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। কোথাও তুলনামূলক বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, আবার কোথাও বরাদ্দের তুলনায় উন্নয়নকাজের চিত্র অনেকটাই কম বলেও অভিযোগও পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রকল্প বরাদ্দে কথিত ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশনের বিষয়টি। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ পেতে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশকে কমিশন দিতে হয়। কমিশন না দিলে কাঙ্ক্ষিত প্রকল্প বা বরাদ্দ পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, বরাদ্দের কমিশনের একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও পৌঁছে দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে যদি কমিশনের নামে কোনো অর্থ দিতে হয়, তাহলে প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

তাদের আশঙ্কা, প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে কমিশন দিতে হলে প্রকৃত উন্নয়নকাজে ব্যয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি কাজের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এদিকে প্রকল্প নির্বাচন ও বরাদ্দের ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ১৪টি ইউনিয়নে কোন প্রকল্পে কী পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং কোন ধরনের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে এসব ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নীতিনির্ধারণের বাইরে ইউনিয়ন পর্যায়ে উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ সীমিত বলেও দাবি স্থানীয় কয়েকজনের।

অভিযোগের বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহের বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কমিশনের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, কমিশনের বিষয়টি যে অভিযোগ করেছে, তাকে আমার সামনে নিয়ে আসেন। তিনি আরও বলেন, সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারের কথা মতে, এখানে এমপি মহোদয় আছেন, এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যান্য সদস্য আছেন।

সেখানে কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে দৌলতপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) বিরুদ্ধে সরাসরি ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই।

দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলী আসাদ উল্লাহ বাচ্চুর কাছেও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, দৌলতপুরে তাঁর যোগদানের বয়স প্রায় পাঁচ মাস। যোগদানের পর এ ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো তথ্য তাঁর কাছে আসেনি। তবে তিনি বলেন, ইউএনওর নির্দেশনায় সিনিয়র প্রকৌশলী প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয়ে নীতিনির্ধারণ করেন।

এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা প্রকৌশলীর অধীনে ফিলিপনগর, মরিচা, চিলমারী, হোগলবাড়ীয়া, রিফাইতপুর, খলিসাকুন্ডী ও বোয়ালিয়া ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী সজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, কোন ইউনিয়নে কী ধরনের বাজেট বরাদ্দ হবে এবং কী ধরনের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে এসব বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী উপজেলা পর্যায়ের সিনিয়র উপজেলা প্রকৌশলী নীতিনির্ধারণ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্প ও কাজ নির্ধারণে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উন্নয়নকাজের পরিমাণ ও দৃশ্যমানতায় ইউনিয়নভেদে পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে হোগলবাড়ীয়া ও দৌলতপুর সদর ইউনিয়নে তুলনামূলক বেশি উন্নয়নকাজ হয়েছে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। অন্যদিকে কয়েকটি ইউনিয়নে একই সময়ের বরাদ্দের তুলনায় দৃশ্যমান উন্নয়নকাজ কম বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ রয়েছে। কোথাও রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, কোথাও দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

আবার কোথাও সৌর বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে কাজের দৃশ্যমানতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, ১৪টি ইউনিয়নের উন্নয়নের জন্য সরকারি বরাদ্দ থাকলে সেই অর্থের সুফল সব এলাকায় সমানভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে না কেন? বছরের পর বছর রাস্তাঘাটের দুর্ভোগ থাকার পরও অনেক এলাকায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ার কারণ কী সেই প্রশ্নও রয়েছে তাদের মধ্যে। তাদের আরও প্রশ্ন, সরকার জনগণের উন্নয়নের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে, সেই অর্থের কত অংশ প্রকৃতপক্ষে জনগণের কাজে ব্যয় হচ্ছে? আর যদি কোনো প্রকল্পে সত্যিই ৩ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়, তাহলে সেই অর্থ কার কাছে যাচ্ছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে সেটা তদন্তের মাধ্যমে বের করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে বরাদ্দ হওয়া সব প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকৃত চিত্র অনেকটাই স্পষ্ট হবে। কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, প্রকল্পের নাম কী, বাস্তবায়ন কমিটিতে কারা রয়েছেন, প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় কত, কাজের বাস্তব অগ্রগতি কতটুকু, কত টাকা বিল উত্তোলন হয়েছে এবং প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের হিসাব কী- এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বরাদ্দপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সিদ্ধান্ত, পরিমাপ বই, বিল-ভাউচার, অর্থ ছাড়ের নথি এবং সরেজমিনে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাদের মতে, নথিপত্র ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র পাশাপাশি যাচাই করা হলে উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, তা সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব। উন্নয়ন বরাদ্দে অনিয়ম, প্রকল্প নির্বাচনে বৈষম্য এবং কমিশন নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের বক্তব্য, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। সব মিলিয়ে দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের উন্নয়ন বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে এখন স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সরকারি অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ কতটা মাঠপর্যায়ে বাস্তব উন্নয়নে রূপ নিচ্ছে এবং বরাদ্দ বণ্টনে কোনো ধরনের কমিশন বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না সেটা নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমেই পরিষ্কার হওয়া সম্ভব। এখন স্থানীয়দের মূল প্রশ্ন, দৌলতপুরের ১৪ ইউনিয়নের উন্নয়ন বরাদ্দ কি সত্যিই জনগণের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, নাকি বরাদ্দের অর্থকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কোনো অস্বচ্ছ কমিশননির্ভর প্রক্রিয়া।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর