কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ফোন কেড়ে নিয়ে সাংবাদিককে আটকে রাখলেন রুমে

বাগবিতণ্ডার ভিডিও করায় ইবি প্রক্টরের গুণ্ডামি! 

 

ইবি প্রতিনিধি ॥ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিককে বাধা প্রদানের ঘটনা ঘটেছে। সন্ত্রাসী কায়দায় ভুক্তভোগী সাংবাদিককে হেনস্তা এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান। গতকাল রবিবার (১৬ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইবনে সিনা বিজ্ঞান ভবনের চতুর্থ তলায় ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের কক্ষে এই ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ওয়াসিফ আল আবরার অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি এবং জার্নালিজম বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে গঠিত তদন্ত কমিটিতে সদস্য সচিব হলেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার জামিরুল ইসলাম।

কমিটির অপর সদস্য হলেন ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আসাদ-উদ-দৌলা। এদিন দুপুর একটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও আওয়ামীপন্থী শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের অফিস কক্ষে ভাঙচুর চালান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা কক্ষের বিভিন্ন আসবাবপত্র এবং কাঁচের সামগ্রী ভাঙচুর করেন। এর কিছুক্ষণ পরেই প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা সেখানে গেলে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। আমি মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতে থাকি।

এক পর্যায়ে প্রক্টর আমার দিকে তেড়ে আসেন এবং আমি ভিডিও করছি কেন তা জানতে চান। আমি পেশাগত কাজে ভিডিও করছি জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং কক্ষের দরজায় থাকা শিক্ষার্থী ও নিরাপত্তা কর্মীদের বলেন, ওরে ধর। এরপর তারা আমার সাথে জবরদস্তি করে আমার ফোন কেড়ে নেয় এবং আমাকে ইইই বিভাগের সভাপতির রুমে আটকে রাখে। এসময় ভুক্তভোগী সাংবাদিক ভবনের নিচে অবস্থান করছিলেন।

হট্টগোলের শব্দ পেয়ে তিনি উপরে উঠে ইইই বিভাগে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান এবং ড. মাহবুবর রহমানকে বাকবিতণ্ডারত দেখতে পেয়ে ভিডিও ধারণ করেন। ঘটনার সময় কক্ষের আলমারি তছনছ এবং মেঝে জুড়ে কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে ছিল। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের অভিযোগ, ড. মাহবুবর রহমানের সঙ্গে ‎বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান ভুক্তভোগী সাংবাদিকের দিকে তেড়ে আসেন এবং ভিডিও ধারণ করছে কেন তা জানতে চান।

কার অনুমতি নিয়ে তিনি বিভাগে প্রবেশ করেছেন সে বিষয়েও জবাব চাইতে থাকেন প্রক্টর। এছাড়াও শিক্ষার্থী ও নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে সাংবাদিককে হেনস্থা এবং তার হাতে থাকা মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। এ সময় ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নিয়ে তাকে ইইই বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. জালাল উদ্দীনের অফিস কক্ষে আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে প্রক্টরিয়াল বডি এবং বিভাগের সভাপতির উপস্থিতিতে ভুক্তভোগী সাংবাদিক কার অনুমতি নিয়ে বিভাগে প্রবেশ করেছে এবং ভিডিও ধারণ করেছে সে ব্যাপারে জেরা করেন প্রক্টর ও বিভাগীয় সভাপতি।

পরে তারা ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের ফোনটি বিভাগীয় সভাপতির নিকট জব্দ রাখার সুপারিশ করেন এবং বিনা অনুমতিতে সাংবাদিক বিভাগে এসেছেন তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান। ঘটনার সময় কোন ক্ষমতাবলে ফোন জব্দ করা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা চান ভুক্তভোগী সাংবাদিক আবরার। এতে বিভাগীয় সভাপতি ড. জালাল উদ্দীন ফোন জমা রাখতে অস্বীকৃতি জানান। তখন বাধ্য হয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান ফোনটি তার নিজ জিম্মায় নিয়ে যান। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের কাছে বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক ওয়াসিফ আল আবরার। ঘ

টনার বিবরণ দিয়ে অভিযোগপত্রে তিনি বলেছেন, ‘আমি মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতে থাকি। এক পর্যায়ে প্রক্টর আমার দিকে তেড়ে আসেন এবং আমি ভিডিও করছি কেন তা জানতে চান। আমি পেশাগত কাজে ভিডিও করছি জানালে তিনি ক্ষিপ্ত হন এবং কক্ষের দরজায় থাকা শিক্ষার্থী ও নিরাপত্তা কর্মীদের বলেন, ওরে ধর। এরপর তারা আমার সাথে জবরদস্তি করে আমার ফোন কেড়ে নেয় এবং আমাকে ইইই বিভাগের সভাপতির রুমে আটকে রাখে।’

পেশাগত দায়িত্বরত একজন গণমাধ্যমকর্মীর সাথে এ ধরনের ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত বলে উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে তিনি বলেন, কোনভাবেই একজন প্রশাসনিক ব্যক্তি ভিডিও করার অপরাধে সাংবাদিকের ফোন কেড়ে নিতে পারেন না। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক, সাংবাদিকের তথ্যের উৎসও জানতে চাইতে পারেন না তিনি। এদিকে প্রক্টরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিলের ঘণ্টাখানেক পর প্রক্টরিয়াল বডির অফিসে ভুক্তভোগী সাংবাদিক আবরারকে ডেকে নিয়ে তার জব্দ করা ফোনটি ফেরত দেওয়া হয়। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, অভিযোগ সঠিক না।

ওরকম কিছু হয়নি। মূলত আমি আমার বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষকের রুমে যাই। ওখানে একটা বিষয় নিয়ে কিছু ছাত্র আগে গিয়ে কিছু হয়তো ভাঙচুর করেছে সেটা শোনার পরে আমি ওখানে যাই। ওখানে স্যারের সাথে আমার কথা হয়। স্যার উত্তেজিতভাবেই কথা বলছিলেন। তখন ওখানে আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরাও চলে আসে। এ সময় আবরার ভিডিও করছিল। তখন ছাত্ররা ওকে ঘিরে ধরে যে অনুমতি ছাড়া ও ভিডিও করা শুরু করছে। এই বিষয়টা ভাইস চ্যান্সেলর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। সাংবাদিকের সঙ্গে এই ঘটনাসহ আজকের পারিপার্শ্বিক যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এর তদন্তে উনি একটা কমিটি করে দিয়েছেন।

আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ছাত্ররা বলছে যে আমাদের সিনিয়র শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছে, তো ও ভিডিও করছে কেন? ছাত্ররা উত্তেজিত হয়ে যায়। একপর্যায়ে ছাত্ররা ওকে বলে যে আপনি ভিডিওটা বন্ধ করেন, এটা আমাদের স্যারদের বিষয়, শিক্ষকরা কথা বলতেছে। তখন ও (আবরার) ওদের সাথে উত্তেজিত হয়ে যায়। তারপরে ওদের মধ্যে একটু ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে ও ফোন দেবে না, এরা ফোন নেবে। এমন অবস্থা হয়ে যাচ্ছিল যে মনে হয় যেন পরিস্থিতির অবনতির দিকে যাচ্ছিল। সে সময় আমাদের সিকিউরিটি অফিসার (নিরাপত্তা প্রধান মিজানুর রহমান) ওরা ফোনটা আমানত হিসেবে নেন।

তারপরে নিরাপত্তার স্বার্থে আবরারকে ওখান থেকে আমরা ডিপার্টমেন্টে নিয়ে যাই। প্রক্টর আরও বলেন, ওর ফোনটা দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সুরক্ষিত অবস্থায়। ওকে বলা হয়েছে যে তোমার কোনো ইনফরমেশন ঠিক আছে কিনা, ও বলল যে ঠিক আছে স্যার। সুরক্ষিত অবস্থায় ওকে ফোনটা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই ঘটনা শিক্ষার্থী ও আবরারের সঙ্গে হয়েছে। আমি জানিও না। আমি তো অধ্যাপক মাহবুবর রহমানের সঙ্গে কথা বলছিলাম। ছাত্ররা জানে না ও সাংবাদিক। এজন্য ঘটনাটা ঘটেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রধান মিজানুর রহমান বলেন, ভিডিও ধারণ করতে দেখে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ওর (আবরার) ওপরে চড়াও হয়। যেহেতু একটা মব তৈরির প্রসেস চলছিল ধস্তাধস্তির পর্যায়ে, ছেলেরা ওর হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নেওয়ার জন্য উদ্যত হয়; সে সময় আমার নিরাপত্তা সেল এবং প্রক্টরিয়াল বডিসহ ওকে সেভ করি এবং মোবাইলটা নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের হেফাজতে রাখি।

ওকে সেভ করতে গিয়ে আমার হাতও কেটে গেছে। সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, এই বিষয়টা ভাইস চ্যান্সেলর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। সাংবাদিকের সঙ্গে এই ঘটনাসহ আজকের পারিপার্শ্বিক যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এর তদন্তে উনি একটা কমিটি করে দিয়েছেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রো-ভিসি বলেন, উনি (ভিসি) যাদেরকে তদন্ত কমিটিতে দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে উনি নিজে কথা বলেছেন এবং দ্রুততার সাথে রিপোর্টটা দিতে বলছেন। উনি গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এটা।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর