বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চল এক গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে। এই জনপদ যেমন জন্ম দিয়েছে কালজয়ী সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল রাজনীতিকের, তেমনি জন্ম দিয়েছে এমন অসংখ্য অকুতোভয় বীর সন্তানের, যাঁরা দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনে নিজেদের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। কুষ্টিয়ার এমনই এক শ্রেষ্ঠ কৃতি সন্তান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর রূপকার হলেন শহীদ সিপাহী আবু তালেব।
রণাঙ্গনে অসীম সাহসিকতা, অটল দেশপ্রেম এবং সম্মুখ সমরে জীবন বাজি রেখে শত্রুর মোকাবিলা করার যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছিলেন, তার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।
Table of Contents
Toggleজন্ম ও পারিবারিক পটভূমি: কুমারখালীর নিভৃত পল্লী থেকে রণাঙ্গনে
শহীদ আবু তালেবের জন্ম ১৯৪৮ সালে (মতান্তরে ১৯৫০ সালে) কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার অন্তর্গত নিভৃত পল্লী কালুয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কছিম উদ্দিন শেখ এবং মাতার নাম রাশেদান বেগম। গ্রামীণ শান্ত পরিবেশে বেড়ে ওঠা আবু তালেব ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত সাহসী, দায়িত্বশীল ও দৃঢ়চেতা স্বভাবের ছিলেন।
দেশমাতৃকার সেবা করার ব্রত নিয়ে তিনি ১৯৬৯ সালে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস’ (ইপিআর)-এ সিপাহী পদে যোগদান করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত ছিলেন। ইপিআরের শৃঙ্খলা ও কঠোর প্রশিক্ষণ তাঁকে পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে একজন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধায় পরিণত করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ: ৮ নম্বর সেক্টরের প্রতিরোধ যুদ্ধ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় আবু তালেব সাতক্ষীরার ভোমরা বর্ডার আউটপোস্টে (বিওপি) সিপাহী পদে কর্মরত ছিলেন। ভোমরা ছিল সাতক্ষীরা শহর থেকে প্রায় ১০ মাইল দূরে অবস্থিত একটি সীমান্তবর্তী এলাকা। ২৫শে মার্চের কালরাতের পর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন দেশব্যাপী গণহত্যা শুরু করে, তখন সাতক্ষীরা সীমান্তে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়।
ভোমরা কাস্টমস অফিস ও বিওপি-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ যুদ্ধে তিনি স্থানীয় তরুণদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সমগ্র সাতক্ষীরা ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলটি তখন মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর সেক্টরের আওতাধীন ছিল।
ভোমরার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (মে ১৯৭১)
মে মাসের শেষের দিকে ভোমরা বাঁধে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর এক ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ২৮ ও ২৯ মে পাকিস্তানি বাহিনীর দুই কোম্পানিরও বেশি সেনা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এই যুদ্ধে সিপাহী আবু তালেব তাঁর এলএমজি (Light Machine Gun) নিয়ে একাই শত্রুর ওপর প্রবল ধ্বংসযজ্ঞ চালান।
তাঁর নিখুঁত ‘সুইপিং ফায়ারে’ পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং তাদের অগ্রসর হওয়া থমকে যায়। থেমে থেমে প্রায় ১৬-১৭ ঘণ্টা ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ২২ এফএফ ব্যাটালিয়নের একজন ক্যাপ্টেনসহ বিপুল সংখ্যক সেনা নিহত হয়েছিল। এই ঐতিহাসিক বিজয়ের নেপথ্যে আবু তালেবের অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশলের বিশাল অবদান ছিল।
লক্ষ্মীপুরের যুদ্ধ ও অতুঙ্গ বীরত্ব: জীবনের শেষ রণাঙ্গন
১৯৭১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের দিকে ভারত থেকে এসে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে অতর্কিত আক্রমণ (গেরিলা হামলা) তীব্র করে তোলেন। সাতক্ষীরার লক্ষ্মীপুরে পাকিস্তানি সেনাদের এমন একটি শক্তিশালী অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল, যা সীমান্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করছিল। এই ক্যাম্পটি ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয় ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ড।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা লক্ষ্মীপুর ক্যাম্পে আক্রমণ চালান। সিপাহী আবু তালেব ছিলেন সম্মুখভাগের আক্রমণকারী (Front-line assault) দলে। মূল লক্ষ্য ছিল সামনে থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ করে শত্রুকে ব্যতিব্যস্ত রাখা, যাতে পেছনের দল অতর্কিত হামলা চালিয়ে ক্যাম্পটি সম্পূর্ণ দখল করে নিতে পারে।
শাহাদাতবরণ ও আত্মত্যাগ
যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনীও পাল্টা তীব্র আক্রমণ চালায়। চারদিকে গোলাগুলির বিকট শব্দে প্রকম্পিত গোটা এলাকা। শত্রুর ভারী অস্ত্রের মুখেও আবু তালেব একবিন্দু পিছু হটেননি। তিনি তাঁর এলএমজি হাতে নিয়ে ক্রল করে (বুকে ভর দিয়ে) শত্রুর ক্যাম্পের দিকে এগোতে থাকেন এবং অনবরত ফায়ার করতে থাকেন।
যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করলে একপর্যায়ে শত্রুর দিক থেকে ছুটে আসা একঝাঁক গুলি তাঁর শরীর ভেদ করে। কিন্তু এই অকুতোভয় বীর গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও দমে যাননি। মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অসীম মনোবলের সঙ্গে গুলি চালানো অব্যাহত রাখেন। রণাঙ্গনের মাটিতেই নিভে যায় তাঁর জীবনপ্রদীপ, জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের এক অমর বীরত্বগাথা।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ‘বীর উত্তম’ খেতাব
যুদ্ধে শহীদ হওয়ার পর সিপাহী আবু তালেবকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে সমাহিত করা হয়। রণাঙ্গনে তাঁর এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং সম্মুখ সমরে অসাধারণ বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করে।
সরকারি গেজেট অনুযায়ী বীর উত্তম হিসেবে তাঁর গেজেট নম্বর ৫৩ এবং খেতাবের সনদ নম্বর ৪৫। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রেকর্ডে তাঁর পরিচিতি নম্বর (ID No.) ১৭৬৬৩।
কুষ্টিয়ার ইতিহাসে উত্তরাধিকার ও প্রাসঙ্গিকতা
শহীদ আবু তালেব (বীর উত্তম) কেবল কুষ্টিয়ার নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গর্ব। একটি সাধারণ গ্রামীণ পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার এই অনন্য দৃষ্টান্ত নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেমের এক চিরন্তন উৎস। বর্তমান সময়ে যখন মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানা তরুণ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য, তখন আবু তালেবের মতো সম্মুখসারির যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই স্বাধীনতা কত চরম মূল্যের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হিসেবে তাঁর নাম স্থানীয় ইতিহাস ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।






