কলকাতায় ‘শিখা ইন’ হোটেলে অগ্নিকান্ড
নিজ সংবাদ ॥ কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার ‘শিখা ইন’ হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ নিহত পাঁচ বাংলাদেশির লাশ শুক্রবার সন্ধ্যার পর যশোরের বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে দেশে আসার কথা থাকলেও ছাড়পত্র জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর থেকে মামলাটি তদন্ত করছিল কলকাতার নিউমার্কেট থানা-পুলিশ। লালবাজারের পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মামলাটির তদন্তভার লালবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এতে সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি সংগ্রহসহ মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সাময়িক জটিলতা তৈরি হয়। আজ শনিবার (২২ আগস্ট) সকালের মধ্যে পাঁচজনের লাশ বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন বেনাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশের অফিসার ইনচার্জ সাইফুর রহমান খান।
তিনি জানান, বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও ভারতের স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় এনওসি বা ছাড়পত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে শুক্রবার লাশগুলো দেশে আনা সম্ভব হয়নি। তবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে শনিবার সকাল নাগাদ পাঁচজনের লাশ বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে আসবে।
কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মোহাম্মদ খালেদ গতকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) দুপুরে তাঁর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারি খরচে নিহতদের মরদেহ দেশে পৌঁছে দেওয়া হবে। কাগজপত্রের কিছু জটিলতার কারণে আজ মরদেহ পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। রাতের মধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আগামীকাল সকালে সড়কপথে মরদেহগুলো দেশের উদ্দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।’
ডেপুটি হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, আইনি জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট থানা থেকে জিডির কপি না পাওয়ায় গতকাল বিকেল ৫টা পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়নি। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে শনিবার সকালে মরদেহগুলো বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর মরদেহগুলো সেখানেই রাখা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় মরদেহ বহনের জন্য কফিন নেওয়া হয়েছে। রাতের মধ্যে মরদেহ হস্তান্তর হলে সেগুলো স্থানীয় একটি হিমঘরে রাখা হবে বলে জানিয়েছেন কলকাতায় থাকা দেবাশীষের স্বজনেরা।
ডেপুটি হাইকমিশন সূত্রে আরও জানা গেছে, সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন, শিশু সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম হোসেনের মরদেহ এবং সাভারের আমিনবাজারের আহমেদ বাবুর মরদেহ যশোরের বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করবে। আর সাতক্ষীরার আলিমুজ্জামান সাজুর মরদেহ ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে পাঠানো হবে। কলকাতায় দেবাশীষের পরিবারের সদস্যদের মরদেহ গ্রহণের জন্য তাঁর ভায়রা ফিরোজ হাসান রয়েছেন।
বুধবার সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া থেকে তিনি কলকাতায় পৌঁছান। এ ছাড়া কলকাতায় থাকা দেবাশীষের আত্মীয়রাও সেখানে রয়েছেন। দেবাশীষের আত্মীয় কৃষ্ণ নন্দী বলেন, ‘আমরা মরদেহ বুঝে নেওয়ার জন্য মর্গে এসেছি। সবকিছু ঠিক থাকলে শনিবার বাংলাদেশের উদ্দেশে মরদেহ পাঠানো হবে। অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার এস এম আলিমুজ্জামান সাজুর লাশ ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করবে।
একই জেলার অধিবাসী নিহত রেবতী সরকারের পরিবারের পক্ষ থেকে তার লাশ ভারতে সৎকার করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক রুহুল আমিন। নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে কুষ্টিয়ার একই পরিবারের চারজন রয়েছেন। তারা হলেন কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া মোহিনী মিল এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯), তার স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), তাদের একমাত্র সন্তান স্বর্ণশীষ দত্ত (৩) এবং আফসানার বাবা আকরাম আলী (৬৪)।
দেবাশীষ দত্ত দৈনিক আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল চ্যানেল ৯ এর কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা শারমীন অসুস্থ থাকায় চিকিৎসার জন্য তাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কলকাতায় গিয়েছিলেন দেবাশীষ দত্ত। সেখানে নিউমার্কেট এলাকার শিখা ইন হোটেলে অবস্থানকালে অগ্নিকাণ্ডে তারা নিহত হন। নিহত অন্য বাংলাদেশি হলেন ঢাকার সাভারের আমিনবাজার এলাকার কসমেটিকস ব্যবসায়ী বাবু আহমেদ (৩৭)। তিনি ব্যবসায়ীক কাজে জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন।
গত ১৯ আগস্ট বুধবার রাত ২টার দিকে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহত বাংলাদেশিদের লাশ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন। তবে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রের জটিলতায় শুক্রবার লাশ দেশে আসেনি। শনিবার লাশগুলো বেনাপোল বন্দরে পৌঁছানোর পর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন ইমিগ্রেশন পুলিশের ওসি সাইফুর রহমান খান। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দেবাশীষ দত্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন ছিলেন মুসলিম। মৃত্যুর পর আফসানা শারমিনের মরদেহ কোন ধর্মীয় রীতিতে সৎকার করা হবে, তা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনা হয়।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত জানান, আফসানা জীবিত অবস্থায় তাঁর মাকে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়। মেয়ের এই ইচ্ছার কথা জানার পর তাঁর পরিবারও সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, আফসানার মা যেহেতু মেয়েকে মুসলিম রীতিতে দাফন করতে চান, তাই তাঁর ইচ্ছাকেই সম্মান জানানো হবে। আফসানার মরদেহ তাঁর বাবা আকরাম হোসেনের মরদেহের সঙ্গে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
দেবাশীষ দত্তসহ তাঁর পরিবারের চার সদস্যের সৎকার ও দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন। নিহত প্রত্যেকের জন্য ২৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ দিকে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাব নেতাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের মরদেহ পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে সৎকারের পরিবর্তে বিনা মূল্যে শ্মশানে সৎকারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানিয়েছেন কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আল মামুন সাগর।
আগুনের ঘটনায় হোটেলটির ইজারাদার আবু জাফরসহ দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা পুলিশ। গ্রেপ্তার আবু জাফর জোড়াসাঁকোর বাসিন্দা। ঘটনার পর থেকে হোটেলের মূল মালিক পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার রাতে হোটেল শিখা ইনে আগুন লেগে দমবন্ধ হয়ে ৭ বাংলাদেশি ও ২ ভারতীয়সহ মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। এদিকে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার আরো ১৭টি হোটেলের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করেছে পশ্চিমবঙ্গের দমকল বিভাগ।
ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি না থাকার কারণে এই শোকজ নোটিশ জারি। এর আগে ৯টি আবাসিক হোটেল ও ৪টি রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি করেছিল পশ্চিমবঙ্গের দমকল বিভাগ। সব মিলিয়ে মোট ২৬টি হোটেল ও ৪টি রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হলো।








