দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক কঠিন সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন দৌলতপুর আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা।
গতকাল মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে বাচ্চু মোল্লা বলেন, জিয়াউর রহমান দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির যাত্রা শুরু হয়।
১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে দলটি দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার রাজনৈতিক প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যায়। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান শুধু একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেননি; বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও মতাদর্শের মানুষকে একটি বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রত্যয়।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের ত্যাগ ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরে বাচ্চু মোল্লা বলেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরেছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। তিনি প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দলকে সংগঠিত করেছেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে, কারাবরণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্য দিয়েও তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।
তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ত্যাগ বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়। তিনি ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বাচ্চু মোল্লা বলেন, জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং খালেদা জিয়ার ত্যাগ-সংগ্রামকে সামনে রেখে আমাদের রাজনীতি করতে হবে।
রাজনীতির উদ্দেশ্য হতে হবে জনগণের কল্যাণ, দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। দলের নাম ব্যবহার করে অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বাচ্চু মোল্লা বলেন, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, সালিশ-বাণিজ্যকারী ও মাদক ব্যবসায়ীরা বিএনপির কেউ নয়। এ ধরনের লোকদের দল কোনো সাপোর্ট দেবে না। বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে বুকে ধারণ করে সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতি করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি যেন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। দৌলতপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দৌলতপুরের রাস্তাঘাটসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে।
তবে দেশের গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অবস্থান জনগণের সামনে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক, তথ্যনির্ভর ও জনগণের স্বার্থকেন্দ্রিক। তারা বরাবরই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে বেইমানি করেছে। দেশের মানুষ তাদের কর্মকাণ্ড বিচার-বিশ্লেষণ করেই নির্বাচনে সিদ্ধান্ত দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতাই এনেছে।
তাই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে দায়িত্বশীল ও গণমুখী রাজনীতি করতে হবে। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বাচ্চু মোল্লা বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু একটি খাতে পড়ে না; কৃষি, শিল্প, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ে। জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সুশাসন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্লাশ ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, খুব শীঘ্রই এই সংকট থেকে আমরা বেরিয়ে আসবো। আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বাচ্চু মোল্লা বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, সৎ, যোগ্য ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দলীয় শৃঙ্খলা মেনে কাজ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের সংঘাত, বিশৃঙ্খলা কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধে জড়ানো যাবে না। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বাচ্চু মোল্লা বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দলের অতীতের আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক আদর্শ ও নেতাকর্মীদের ত্যাগ স্মরণ করার দিন।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের দিন। দৌলতপুরে বিএনপিকে আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল কুদ্দুসের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি শামীম রেজা মোল্লা, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও দৌলতপুর সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, সাংগঠনিক সম্পাদক শের আলী সবুজ, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা ও পিয়ারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জহুরুল করিম বিশ্বাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া শহীদ সরকার মঙ্গল, আবিদ হাসান মনটি সরকার, প্রফেসর আতাউল, খন্দকার লস্কর, সিরাজুল হক, জিয়ারুল হক, সাবেক চেয়ারম্যান আজমল হক, সাবেক কৃষকদল নেতা হারুন অর রশিদ, কৃষকদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরজ উল্লাহ, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ বাচ্চু, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মাসুদুজ্জামান রুবেল, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শামীম, তাঁতীদলের সাংগঠনিক সম্পাদক তরিকুল ইসলামসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সভায় বক্তারা বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা ও আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করে দৌলতপুরে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী, গতিশীল ও সুসংগঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।









