কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ভেড়ামারায় রহস্যময় এক বটগাছের পাতা ছিড়লেই বিপদ

কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ব্যাকাপুল সংলগ্ন সজনিতলা এলাকা। সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল বটগাছ। উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের নওদা ক্ষেমিরদিয়াড় গ্রামের এই বটগাছটিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে আবর্তিত হচ্ছে একের পর এক গা-ছমছমে লোকগাথা, অলৌকিক বিশ্বাস আর ভৌতিক আতঙ্ক। তবে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই অলৌকিকতার নেপথ্যে রয়েছে এক সহজ প্রাকৃতিক ব্যাখ্যা।
8 fay 9 2 24 ভেড়ামারায় রহস্যময় এক বটগাছের পাতা ছিড়লেই বিপদ

পাতা ছিড়লেই জ্বর: শতাব্দীর পুরোনো লোকগাথা

নওদা ক্ষেমিরদিয়াড় গ্রামের প্রবীণদের মতে, প্রাচীন এই সজনিতলা বটগাছটির সঠিক বয়স ঠিক কত, তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারেন না। কারো মতে একশো বছর, আবার কারো মতে এর ইতিহাস দেড়শো বছর ছাড়িয়ে গেছে।
গাছটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা অলৌকিক গল্প। একসময় বিশ্বাস করা হতো—
  • গাছের পাতা ছেঁড়ার শাস্তি: ভুলবশতও এই গাছের একটি পাতা ছিড়লে নাকি তৎক্ষণাৎ শরীরে প্রচণ্ড জ্বর চলে আসত।
  • জীন-পরীর বিয়ে ও রহস্যময় শব্দ: গভীর রাতে বটগাছ থেকে নানা ধরনের অস্পষ্ট ও অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসত। স্থানীয় মানুষ বলতেন, সেখানে নাকি জীন-পরীদের বিয়ের অনুষ্ঠান চলে।
  • সন্তান লাভের মানত: সন্তানহীন নারীরা সন্তান লাভের আশায় এই গাছের মূল ও শিকড়ে দুধ ঢেলে মানত করতেন। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও নিয়মিত এখানে পূজা-অর্চনা করতেন।
একসময় রায়টা, গোলাপনগর ও জুনিয়াদহ গ্রামের মানুষকে যাতায়াত করতে হতো এই গা-ছমছমে পথ দিয়েই। রাতে তো বটেই, দিনের আলোতেও থমথমে জঙ্গলঘেরা এই বটতলায় একা যেতে গা শিউরে উঠত পথচারীদের।
“আগে রাতের বেলায় বটগাছের কাছ থেকে অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে আসত। গ্রামের প্রবীণরা বলতেন জীন-পরীরা সেখানে ভিড় জমিয়েছে। ভয়ে কেউ ওই পথ মাড়াত না।”
জমির উদ্দীন, স্থানীয় বাসিন্দা (নতুন হাট গ্রাম)

ডাকাত নবীর উদ্দীনের সেই ভয়ংকর রাত

বটগাছটিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত গল্পটি ডাকাত নবীর উদ্দীনকে নিয়ে। লোকমুখে শোনা যায়, এক রাতে সজনিতলা বটগাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিলেন নবীর উদ্দীন ও তাঁর দলবল। হঠাৎই কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এসে নবীর উদ্দীনের গলা চেপে ধরে। পরদিন সকালে আশেপাশের ১০টি গ্রামের মানুষ গিয়ে অচেতন অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে। এই ঘটনার পর মানুষের মনে ভূত-প্রেতের ভয় আরো বহুগুণে জাঁকিয়ে বসে।

ভূতের ভয় নাকি অক্সিজেনের ঘাটতি? কী বলে বিজ্ঞান?

একটি বটগাছের নিচে রাতে গেলে কেন মানুষের শ্বাস আটকে আসে বা মাথা ঘোরে? এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভেড়ামারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা সুলতানা।
তিনি জানান, ঘটনাটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক এবং সালোকসংশ্লেষণ (Photosynthesis) ও শ্বসন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত:
  • দিনের প্রক্রিয়া: দিনের বেলায় সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং উপজাত হিসেবে বাতাসে প্রচুর অক্সিজেন ছেড়ে দেয়।
  • রাতের প্রক্রিয়া: সূর্যাস্তের পর আলো না থাকায় সালোকসংশ্লেষণ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু গাছের স্বাভাবিক শ্বসন প্রক্রিয়া অবিরাম চলতে থাকে। এ সময় অন্যান্য প্রাণীর মতোই গাছ বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করে।
বটগাছের মতো বিশাল আকৃতির ঘন পাতার গাছের নিচে রাতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের একটি অদৃশ্য আস্তরণ তৈরি হয়। কেউ যদি রাতে এই গাছের নিচে বেশিক্ষণ অবস্থান করে বা ঘুমায়, তবে প্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে কার্বন ডাই-অক্সাইড ঢুকে যায়। ফলে রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়, বুক চেপে আসে এবং মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে। বিজ্ঞান না জানার কারণে সাধারণ মানুষ এই প্রাকৃতিক ঘটনাকেই “ভূতে ধরা” বা “অদৃশ্য ছায়ার আক্রমণ” বলে ভুল ভেবে এসেছে।

ভূতের ভয় অতীত, বর্তমানের নতুন আতঙ্ক

কালের বিবর্তনে সজনিতলার সেই কাঁচা পথ এখন পাকা সড়কে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় ভূতের ভয়ও অনেকটা কেটেছে মানুষের মন থেকে। তবে সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে আতঙ্কের রূপ।
স্থানীয়দের মতে, আগে ছিল ভূতের ভয়, আর এখন তৈরি হয়েছে অপরাধীদের ভয়। ঝোপঝাড় কমে গেলেও রাত নামলেই নির্জন এই বটতলা পরিণত হয় মাদকসেবী ও দুষ্কৃতীদের অভয়ারণ্যে। সন্ধ্যার পর পথচারীরা এখনো ভয়ে ভয়েই এই পথ অতিক্রম করেন।

ঐতিহ্য ও প্রকৃতির মেলবন্ধন

ভয় আর রহস্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে না এই বটগাছটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এর ঝুরি ও মাটির গভীরে নেমে যাওয়া শিকড়গুলো দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। শতবর্ষী এই সজনিতলা বটগাছটি আজ কেবল কোনো রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু নয়, এটি ভেড়ামারার এক অনন্য ঐতিহ্যবাহী প্রাকৃতিক নিদর্শন।
Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর