কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

প্রমিত বাংলা ভাষার জননী: কুষ্টিয়ার লোকভাষা ও আধুনিক বাংলার বিকাশ

একটি ভাষার সর্বজনীন রূপ বা মান্য রূপ হঠাৎ করে তৈরি হয় না; এর নেপথ্যে থাকে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা কথ্য ভাষার ঐতিহ্য। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রমিত রূপ রূপান্তরের ক্ষেত্রে সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাটি পালন করেছে গড়াই-পদ্মা বিধৌত নদীয়া-কুষ্টিয়া অববাহিকার কথ্য ভাষা। বাংলা ভাষার ব্যাকরণগত ও উচ্চারণগত মানদণ্ড গঠনে এই অঞ্চলের লোকভাষাই ভিত্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যার কারণে ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিচারে কুষ্টিয়াকে ‘প্রমিত বাংলা ভাষার জননী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

নদীয়া-কুষ্টিয়া অববাহিকা ও ভাষার ঐতিহাসিক রূপান্তর

আঠারো শতকের শেষভাগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের প্রধান মাধ্যম ছিল কাব্য, যেখানে স্থানীয় বিভিন্ন উপভাষার প্রভাব দেখা যেত। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতে যখন বাংলা গদ্যের সূচনা ঘটে, তখন একটি কৃত্রিম ও সংস্কৃত শব্দনির্ভর ‘সাধু ভাষা’ তৈরি করা হয়। এই সাধু ভাষা ছিল মূলত কাঠখোট্টা, জটিল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভাব প্রকাশের অযোগ্য।
পণ্ডিতদের তৈরি এই কৃত্রিম গদ্যের সমান্তরালে নদীয়া ও তৎকালীন কুষ্টিয়া অঞ্চলের বিস্তৃত জনপদে গড়ে উঠেছিল একটি সাবলীল ও গতিশীল মুখের ভাষা। কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ, শান্তিপুর থেকে শুরু করে শিলাইদহ, কুমারখালী ও কুষ্টিয়া সদরের সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের কথাবার্তায় যে স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ ও রূপ ফুটে উঠত, তা সমকালীন সচেতন সাহিত্যিকদের নজর কাড়ে। এটি অনুধাবন করা গিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের বোধগম্য সাহিত্যের প্রসার ঘটাতে হলে এই অঞ্চলটির ভাষাকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

ভাষাবৈজ্ঞানিক দলিল ও দক্ষিণ-পূর্ব রাঢ়ী উপভাষা

ভাষাবিজ্ঞানীদের নিরপেক্ষ গবেষণায় কুষ্টিয়া-নদীয়া অঞ্চলের ভাষাকে প্রমিত রূপের প্রধান উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আধুনিক ভাষাতত্ত্বের জনক জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন তাঁর বিখ্যাত গবেষণা গ্রন্থ ‘লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’ (১৯০৩-১৯২৮)-এ নদীয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের কথ্য ভাষাকে বাংলা ভাষার সবচেয়ে মার্জিত রূপ বলে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য অরিজিন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অব দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ’ (ওডিবিএল, ১৯২৬)-এ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে, আধুনিক প্রমিত বাংলা বা মান্য চলিত ভাষা মূলত রাঢ়ী উপভাষার দক্ষিণ-পূর্ব শাখার রূপান্তরের ফলাফল। নদীয়া এবং কুষ্টিয়ার পদ্মা-গড়াই অববাহিকার মানুষের কথ্য ভাষাই ছিল এই দক্ষিণ-পূর্ব রাঢ়ী উপভাষার প্রাণকেন্দ্র। অধ্যাপক সুকুমার সেনও তাঁর ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় এই মতকে সমর্থন করে দেখিয়েছেন কীভাবে কুষ্টিয়া অঞ্চলের লোকভাষার ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম রূপ আধুনিক প্রমিত ব্যাকরণের ভিত্তি তৈরি করেছে।

শিলাইদহের রবীন্দ্র-সাধনা ও ‘সবুজ পত্র’-এর আন্দোলন

সাধু ভাষার প্রথাগত শৃঙ্খল ভেঙে সাধারণ মানুষের ভাষারীতিকে সাহিত্যিক মর্যাদা দেওয়ার ক্ষেত্রটি তৈরি হয়েছিল কুষ্টিয়ার মাটিতেই। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯০ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষ, চাষি, জেলে এবং বাউলদের জীবনযাত্রা ও মুখের ভাষার সাথে তাঁর গভীর পরিচয় ঘটে।
শিলাইদহে বসেই রবীন্দ্রনাথ অনুধাবন করেন যে সাধু ভাষার চেয়ে এই অঞ্চলের স্বাভাবিক কথ্য ভাষা অনেক বেশি প্রাঞ্জল ও গভীর আবেগ প্রকাশের উপযোগী। তাঁর বিখ্যাত চিঠি সংকলন ‘ছিন্নপত্র’, ‘গল্পগুচ্ছ’-এর সিংহভাগ গল্প এবং নাটকগুলোতে তিনি কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাধারণ মানুষের আঞ্চলিক শব্দ, ছন্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে ১৯১৪ সালে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী তাঁর ঐতিহাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজ পত্র’-এর মাধ্যমে প্রমিত চলিত ভাষাকে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠার যে আনুষ্ঠানিক আন্দোলন শুরু করেন, রবীন্দ্রনাথ তাতে পূর্ণ সমর্থন দেন। প্রমথ চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ যৌথভাবে নদীয়া-কুষ্টিয়ার মানুষের মুখের ভাষাকেই সার্বজনীন সাহিত্যিক চলিত ভাষা অর্থাৎ আধুনিক প্রমিত বাংলা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি কুষ্টিয়ার সন্তান মীর মশাররফ হোসেন তাঁর ‘বিষাদ সিন্ধু’ ও অন্যান্য গদ্যসাহিত্যে এবং কাঙ্গাল হরিনাথ সম্পাদকীয় নিবন্ধে এ অঞ্চলের প্রাণবন্ত ভাষারীতি ব্যবহার করে একে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করান।

ধ্বনিগত মাধুর্য ও প্রাঞ্জলতার ভাষাতাত্ত্বিক কারণ

অন্যান্য আঞ্চলিক উপভাষাকে অতিক্রম করে কেন নদীয়া-কুষ্টিয়ার ভাষাই প্রমিত বাংলা ভাষার রূপ পেল, তার পেছনে কয়েকটি স্পষ্ট ভাষাবৈজ্ঞানিক কারণ বিদ্যমান। এ অঞ্চলের ভাষায় ধ্বনিগত স্পষ্টতা ও স্বরসঙ্গতির (Vowel Harmony) প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাকৃতিক। এখানে শব্দের উচ্চারণে অপ্রয়োজনীয় অনুনাসিকতা কিংবা মহাপ্রাণ ধ্বনির বিকৃতি ঘটে না।
এছাড়া সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের সহজীকরণ এই ভাষাকে অনন্য গতিশীলতা দিয়েছে। যেমন—পূর্ববঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলে ব্যবহৃত ‘করতিছি’ বা ‘করতাসি’ এবং পশ্চিমবঙ্গের দূরবর্তী অঞ্চলের জটিল রূপের বিপরীতে নদীয়া-কুষ্টিয়ার মানুষের মুখে উচ্চারিত ‘করছি’, ‘যাচ্ছি’, ‘খেয়েছি’-র মতো সুসংগঠিত রূপগুলো সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা পায়। এই ভাষার স্বরপ্রক্ষেপণ ও উচ্চারণের মাধুর্য এমন ছিল যা খুব সহজেই ঢাকা থেকে কলকাতা—উভয় ভূখণ্ডের শিক্ষিত মানুষের কাছে মান্য ভাষা হিসেবে গৃহীত হতে পেরেছে।

বাংলা ভাষা সংস্কৃতিতে কুষ্টিয়ার সার্বজনীন উত্তরাধিকার

কুষ্টিয়ার মাটির এই ভাষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ বা সাহিত্যের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি যুক্ত হয়েছে বঙ্গীয় মননের গভীরতম ধারার সাথে। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের কালজয়ী পদগুলো এই অঞ্চলের লোকভাষাকে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়। লালনের গানের সহজ-সরল অথচ ব্যঞ্জনাময় ভাষা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ভাষাতেই পরম সত্যকে প্রকাশ করা সম্ভব।
শিক্ষা, গণমাধ্যম, জাতীয় সাহিত্য এবং দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের জন্য আজ আমরা যে প্রমিত বাংলা ভাষা ব্যবহার করি, তার শিকড় পুথিত রয়েছে কুষ্টিয়ার জনপদের মানুষের মুখে মুখে। আঞ্চলিক ভাষার স্বাভাবিক মাধুর্য কীভাবে একটি পুরো জাতির মান্য ভাষায় রূপান্তরিত হতে পারে, কুষ্টিয়ার লোকভাষা তার শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক প্রমাণ। ভাষাতাত্ত্বিক এই অতুলনীয় অবদানের কারণেই কুষ্টিয়া বাংলা ভাষার ইতিহাসে ‘প্রমিত বাংলা ভাষার জননী’ হিসেবে চিরভাস্বর।
লেখক,
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর
Tags :

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

https://sufifaruq.com/

সর্বশেষ খবর