উপনিবেশিক আমলে যখন ভারতের ইতিহাস মূলত ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা হচ্ছিল, তখন যে কয়েকজন বাঙালি পণ্ডিত নিজস্ব শেকড়ের সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় অন্যতম। তিনি একাধারে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ এবং সুলেখক। কুষ্টিয়ার এই কৃতী সন্তান আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস চর্চার যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, তা আজও বাংলার অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

Table of Contents
Toggleজন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ১৮৬১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন নদীয়া জেলার (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা) মিরপুর উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মথুরানাথ মৈত্রেয় ছিলেন পেশায় আইনজীবী। ছোটবেলা থেকেই একটি সুশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে জ্ঞানানুশীলনের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তৈরি হয়।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের সূচনা
প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি কুমারখালী ও পরে রাজশাহীতে পড়াশোনা করেন। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে আইনশাস্ত্রে (বিএল) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রাজশাহীতেই আইন পেশায় যুক্ত হন। আইন পেশায় যুক্ত থাকলেও তাঁর মূল ধ্যানজ্ঞান ছিল ইতিহাস ও সাহিত্য।

বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠনে অবদান
বাংলার নিজস্ব ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। তাঁর কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল বিদেশি ঐতিহাসিকদের রচিত তথ্যের অন্ধ অনুকরণ না করে, প্রাথমিক উৎস (Primary Sources) থেকে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা।
‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থ রচনা ও ঐতিহাসিক ভ্রান্তি নিরসন
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হলো ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘সিরাজদ্দৌলা’। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা সিরাজদ্দৌলাকে একজন অত্যাচারী ও লম্পট শাসক হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন। বিশেষ করে হলওয়েল বর্ণিত ‘অন্ধকূপ হত্যা’ (Black Hole Tragedy) তত্ত্বকে ব্রিটিশরা নিজেদের আগ্রাসনকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তৎকালীন নথিপত্র ও প্রাথমিক উপাদান অত্যন্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে, অন্ধকূপ হত্যার ঘটনাটি ছিল একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অতিরঞ্জন। তাঁর এই গ্রন্থটি বাঙালি সমাজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং নবাব সিরাজদ্দৌলাকে একজন দেশপ্রেমিক শাসক হিসেবে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা ও বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি প্রতিষ্ঠা
ইতিহাস রচনার পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯১০ সালে তিনি দিঘাপতিয়ার রাজকুমার শরৎকুমার রায় এবং প্রখ্যাত পণ্ডিত রমাপ্রসাদ চন্দকে সঙ্গে নিয়ে ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ (Varendra Research Society) প্রতিষ্ঠা করেন।
এই সমিতির মূল লক্ষ্য ছিল উত্তরবঙ্গ বা প্রাচীন বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, শিলালিপি, মুদ্রা ও ভাস্কর্য সংগ্রহ এবং তা নিয়ে গবেষণা করা। তাঁদের এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ পরবর্তীতে ‘বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা বাংলাদেশের প্রাচীনতম জাদুঘরগুলোর একটি।
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি ও সাহিত্যকীর্তি
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় কেবল সিরাজদ্দৌলাকে নিয়েই গবেষণা থামিয়ে রাখেননি। তাঁর অন্যান্য কালজয়ী রচনাবলির মধ্যে রয়েছে:
- মীরকাসিম: এই গ্রন্থে তিনি বাংলার আরেক স্বাধীনচেতা নবাবের শাসনকাল ও ব্রিটিশদের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ তুলে ধরেন।
- ফিরিঙ্গিবণিক: পর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকদের বাংলায় আগমন ও তাদের কার্যকলাপ নিয়ে এই গ্রন্থটি রচিত।
- গৌড়লেখমালা: এটি প্রাচীন বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এই গ্রন্থে তিনি পাল রাজাদের আমলের তাম্রশাসন ও শিলালিপিগুলোর সংস্কৃত পাঠ ও বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন।
তিনি ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন, যা মূলত ইতিহাস চর্চাকে জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হতো।

সমকালীন ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সম্পর্ক
অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র জ্ঞান ও পান্ডিত্যের কদর তৎকালীন সুশীল সমাজে ব্যাপকভাবে সমাদৃত ছিল। সে যুগের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে অক্ষয়কুমারের গভীর বন্ধুত্ব ও বৌদ্ধিক সম্পর্ক ছিল। ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থটি প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, ইতিহাসকে বিদেশিদের হাত থেকে উদ্ধার করে দেশের মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার যে সাহস অক্ষয়কুমার দেখিয়েছেন, তা জাতির আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সহায়ক হবে। সাহিত্য চর্চা ও ঐতিহাসিক গবেষণার নানা বিষয়ে তাঁদের মধ্যে নিয়মিত পত্রালাপ হতো।
প্রয়াণ ও উত্তরাধিকার
১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৬৯ বছর বয়সে এই মহান ইতিহাসবিদের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি নিরলসভাবে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের সাধনা করে গেছেন। কুষ্টিয়ার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা এই মানুষটি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে বাংলার ইতিহাসকে যে বিজ্ঞানভিত্তিক ও গবেষণাধর্মী রূপ দিয়েছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের ইতিহাসবিদদের জন্য একটি আদর্শ পাঠ্য।









