রাইফেলের ঠান্ডা নলটা সোজা মেজর অশোক তারার বুক ছুঁয়ে আছে। ট্রিগারে রাখা আঙুলটা একটানা কাঁপছে। পাকিস্তানি সেনাসদস্যটি নিতান্তই অল্পবয়সী—গোফ ওঠা এক তরুণ, প্রচণ্ড স্নায়ুচাপে বারবার ঠোঁট চাটছে সে। একটু এদিক-সেদিক হলেই ছেলেটি ট্রিগারে চাপ দেবে, আর মুহূর্তেই একটি বুলেট বুক ভেদ করে বেরিয়ে যাবে। দু’দুটো যুদ্ধে ঋদ্ধ সেই বুকের ভেতর তখন ভেসে উঠছিল নয়াদিল্লিতে অপেক্ষারত স্ত্রী আর চার মাসের ছোট্ট শিশুর মুখ। কোনো ভুল পদক্ষেপ নয় (No false move); নিরস্ত্র মেজর তারার পক্ষে অতিরিক্ত ভাবনার কোনো অবকাশ ছিল না। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১। ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একটি অবরুদ্ধ বাড়ি, যেখানে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার।

Table of Contents
Toggleরণাঙ্গন থেকে ধানমন্ডির অবরুদ্ধ বাড়ির পথে
সেদিনের সেই ঐতিহাসিক সকালে মেজর তারার ডিউটি সেখানে ছিল না। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৪ গার্ডস ইউনিটের সঙ্গে তিনি আগরতলা থেকে অগ্রসর হয়েছিলেন। তার মূল দায়িত্ব ছিল পলায়নপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঢাকামুখী রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া এবং অবরুদ্ধ রাজধানী রক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গঙ্গাসাগর যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্বের জন্য তিনি ভারত সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘বীর চক্র’ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। অথচ ঠিক বিজয় অর্জনের পরদিনই তাকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছিল ধানমন্ডির এক সাধারণ বাড়ির গেটে।
পূর্বের দিনই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল এ এ কে নিয়াজী। ডিভিশনাল কমান্ডার মেজর জেনারেল গঞ্জালেস মেজর তারার ইউনিটকে ঢাকা বিমানবন্দরের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। মেইন টার্মিনালের দায়িত্ব পালনের সময় এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কর্নেল বিজয় কুমার চানানার সঙ্গে দেখা করে জানান যে, পাকিস্তানি সেনারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত করছে। কর্নেলের নির্দেশেই মাত্র তিনজন সেনাসদস্যকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডির দিকে রওনা হন মেজর তারা।
চরম উত্তেজনা ও ধানমন্ডির বাড়ির প্রাঙ্গণ
ধানমন্ডির সেই বাড়িটির সামনে পৌঁছানোর পর পথ দেখিয়ে দেওয়া সেই স্থানীয় নেতা ভয়ে সরে পড়েন। এমন সময় এক মুক্তিযোদ্ধা এগিয়ে আসেন মেজর তারার গাড়ির কাছে। তিনি জানান, বাড়ির পাহারায় থাকা পাকিস্তানি সেনারা যেকোনো মুহূর্তে সবাইকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। বাড়ির ছাদে একটি বাঙ্কার স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বসানো রয়েছে লাইট মেশিনগান (এলএমজি)। এছাড়া টেরেস এবং গেটের দুই পাশেও প্রস্তুত রয়েছে ভারী অস্ত্রধারী সেনাসদস্যরা। মাত্র তিনজন সৈনিক নিয়ে এই সুসজ্জিত প্রতিরক্ষা ভেদ করার কোনো প্রচলিত সামরিক সুযোগ ছিল না। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেসিওকে ডেকে নিজের স্টেনগানটি তার হাতে তুলে দিয়ে মেজর তারা নির্দেশ দেন, তাকে কভার করে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াতে।

অদম্য সাহস ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়
বাড়ির খুব কাছে পৌঁছাতেই ছাদ থেকে গর্জে ওঠে হুমকি—আর এক পা এগোলেই গুলি করা হবে। মেজর তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পাল্টা স্পষ্ট কণ্ঠে জানান যে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এবং সম্পূর্ণ নিরস্ত্র; তিনি কেবল কথা বলতে চান। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “আমি আপনাদের সামনে নিরস্ত্র অবস্থায় এসে পৌঁছেছি মানেই আপনাদের সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। বিশ্বাস না হলে আপনাদের অফিসারকে ডেকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।”
সেন্ট্রি তখন তাকে অপেক্ষা করতে বলে এবং একটু পর জানায় যে সে ওপরের অফিসারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছে না। পরবর্তীতে জানা গিয়েছিল যে, ক্যাপ্টেন পদবির সেই পাকিস্তানি অফিসার আগেই পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং যোগাযোগের মাধ্যম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অধস্তন সেনারা আত্মসমর্পণের সঠিক নির্দেশটি পায়নি। ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার ওপর চক্কর কাটছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকটি হেলিকপ্টার। তারা উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন, “ওপরে তাকাও, আমাদের হেলিকপ্টার উড়ছে। পেছনে তাকাও, আমার সৈন্যরা দাঁড়িয়ে আছে। আমার মতো তোমাদেরও নিশ্চয়ই পরিবার ও সন্তান রয়েছে। তোমরা আত্মসমর্পণ করো, আমি কথা দিচ্ছি তোমরা সম্পূর্ণ নিরাপদে নিজেদের ক্যাম্পে বা যেখানে যেতে চাও যেতে পারবে।”

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
কথাগুলো বলতে বলতে তিনি যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গেটের ফাঁক দিয়ে একটি রাইফেলের ঠান্ডা নল তার বুক স্পর্শ করে। ওই কাঁপতে থাকা তরুণ সেনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ছাদে থাকা হাবিলদারের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতর থেকে এক আকুল ও দৃঢ় নারীকণ্ঠ ভেসে এলো— “If you do not save us, they will kill all of us, we know.” (যদি আপনারা আমাদের না বাঁচান, ওরা আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে, আমরা জানি।)
সেই চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও মেজর তারা বুকের ওপর চেপে বসা রাইফেলের নলটি হাত দিয়ে সরিয়ে দিলেন। তার মনে কোনো ভীতি ছিল না; দুই সপ্তাহ আগের গঙ্গাসাগর যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল কীভাবে চরম প্রতিকূলতায় অবিচল থাকতে হয়।
ঐতিহাসিক দলিল ও বন্দিদশার অবসান
পরবর্তীতে ভারতের বার্তা সংস্থা ইউএনআই (UNI)-এর পরিবেশিত খবরে এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছিল:
“A major who led the (Indian) detachment ordered the guards to surrender. They (the Pakistani soldiers), however, refused to move out of the bunker unless ordered by their own officers. The major explained that the Pakistani troops had already surrendered and that they should do the same instead of provoking the troops to eject them. After much argument, they agreed to come out. They were given civilian clothes to wear lest they be shot on the road by vengeful youths.”
দীর্ঘ বোঝাপড়ার পর অবশেষে পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি হয়। বাঙালি উগ্রপন্থী বা ক্ষুব্ধ তরুণদের জনরোষ ও সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য তাদের বেসামরিক পোশাক পরিয়ে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের মুক্তি ও চিরস্থায়ী সুহৃদ সম্পর্ক
বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার পর বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব দৌড়ে এসে মেজর তারাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আবেগমাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, “তুমি আমার সেই ছেলে, যাকে খোদ খোদা নিজে পাঠিয়েছেন।” বাড়ির ভেতরের মানবেতর দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে মেজর তারা দেখেছিলেন, ঘরে কোনো প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র পর্যন্ত ছিল না; মুজিব পরিবারের সদস্যরা মেঝেতে শুতেন এবং তাদের একমাত্র খাবার ছিল কিছু শুকনো বিস্কুট।
পরবর্তীতে মেজর তারার ইউনিট মিজো পাহাড়ি অঞ্চলে বদলি হলেও মুজিব পরিবারের বিশেষ অনুরোধে তারা ঢাকায় অবস্থান করেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পর মেজর তারাকে পরিবারের একজন আপন সদস্যের মতোই স্নেহ করতেন। শহীদ শেখ রেহানা নিয়মিত তাকে চিঠি পাঠিয়ে ‘ভাইয়া’ সম্বোধন করতেন এবং পরিবারের খোঁজখবর নিতেন।

দুই দশকের পরিনতি ও সম্মাননা
২০০৯ সালে সত্তর বছর বয়সে মেজর অশোক তারা পুনরায় ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে যুদ্ধকালীন অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ সম্মাননায় ভূষিত করেন। ইতিহাসের অন্ধকারতম এক অধ্যায়ে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে যে মানুষটি বাংলার মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতার পরিবারকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, মেজর অশোক তারার সেই বীরত্বগাঁথা বাঙালি জাতির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।









