কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে অটো রাইচ মিল!

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাউল মোকাম কুষ্টিয়ার খাঁজানগর। প্রায় ৬ হাজার কর্মজীবি মহিলার শারীরিক শ্রমে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র এই শিল্পাঞ্চল আজ ধ্বংশের পথে। চাউলের গ্রাম খ্যাত এ অঞ্চলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে অবৈধ ভাবে অটো চাউলকল নির্মাণ করায় ইতিমধ্যে ব্যাপক পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে।

 

হুমকির মুখে পতিত হচ্ছে জনসাধারন। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি অটো চাউল কল খাজানগর এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০ টি অটো রাইচ মিলের তরল বর্জ্য শোধনগার ইফলেন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নেই। 

 

সূত্র জানায়, প্রতিটি অটো চাউল কলে ৮’শ মণ ধান সিদ্ধ করতে প্রায় ৩০ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। প্রতিটি অটো চাউল কলে প্রতিদিন প্রায় ১৬’শ মণ ধান সিদ্ধ হয়ে থাকে। এতে একটি আটো কল থেকে প্রায় ৬০ হাজার লিটার দুষিত পানি নির্গত হচ্ছে। এই দুষিত পানি ইফলেন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’র মাধ্যমে শোধন করার আইন রয়েছে। এই আইন লঙ্ঘন করে পরিবেশ দুষন করা হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে জনসাধারন। 

 

বর্তমান ওই অঞ্চলের কবুরহাট, দোস্তপাড়া, খাজানগর, শান্তির মোড়, বড় আইলচারা ও পোড়াদহ এলাকার বিভিন্ন স্থানে চাউল ব্যবসায়ীরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই একের পর এক অটো রাইচ মিল নির্মাণ করে চলেছেন। যা পরিবেশের জন্য চরম হুমকি। 

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই অঞ্চলের বিভিন্ন অটো চাউল কলের বর্জ্য ড্রেন, নালা, খাদ ও জিকে ক্যানালের পানিতে মিশে দুষিত করছে ক্যানালের পানি। ছড়িয়ে পড়েছে র্দূগন্ধ। এতে করে ক্যানালের পানি কৃষকের কৃষি কাজে ব্যাবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

 

ফলে স্থানীয় কয়েক হাজার হেক্টর কৃষি জমির চাষি পরেছে বিপাকে। অটো চাউল কলের বর্জ্য ও গন্ধ যুক্ত পানি ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে চাষিরা। বিষাক্ত পানি ব্যবহার করায় কৃষিজমির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে ও আবাদি ফসলের চরম ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এছাড়া ২৫ হাজারের বেশি পরিবার স্বাস্থ্য ঝুকিতে রয়েছে। শিশুদের বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ওই ক্যানালের পানি ব্যবহারের কারনে কৃষকদের চর্ম রোগসহ নানা রকমের রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।

 

অটো চাউল কল গুলোর তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইফলেন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) থাকা বাধ্যতামূলক থাকলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে অটো চাউলকল মালিকরা ইফলেন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন না করে অবৈধ ভাবে অটো চাউল কল গুলোর দুষিত তরল বর্জ্য ও গন্ধযুক্ত পানি ক্যানালের সাথে সরাসরি সংযোগ করেছেন। যা আইনের পরিপন্থি ও পরিবেশের জন্য চরম হুমকি। 

 

স্থানীয় ২৫ হাজার পরিবার কে বাঁচাতে এলাকার সচেতন মহলের দাবি অটো চাউলকল গুলোর ইফলেন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট ব্যবহার করতে হবে। আর তা না হলে অটো চাউল কল মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে অবৈধ ভাবে নতুন করে অটো চাউলকল নির্মাণকাজ বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষা করতে হবে। এদিকে ওই এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বললে তারা সীমাহীন ক্ষোভ শোনাতে থাকেন অনেকেই। কেউ কেউ এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে পরিবারসহ উচ্ছেদ করার ভয় দেখানো হয় বলে তারা অভিযোগ করেন।

 

তারা আরও বলেন, ড্রেনজ সমস্যা খাঁজানগরবাসীর প্রধান স্থায়ী সমস্যা। স্থানীয়রা অনেক সময় বাধ্য হয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের ড্রেনজ সমস্যা নিরসন করার চেষ্টা করে থাকে। এ ব্যাপারে সরকারের কোন কার্যকরী ভূমিকা নেই। শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে ড্রেনজ সমস্যাসহ বিবিধ বিষয়াদি সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সকল মিল মালিকদের এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়াও সরকারের সহযোগীতা থাকতে হবে। 

 

অনেক সময় এক মিলের পানি অন্য মিলের ভিতর দিয়ে গড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। চাউল মিল গুলো থেকে প্রতিদিন প্রচুর ছাই বেড় হচ্ছে। এগুলো অনেকেই খোলা স্থানে রাখেন, আবার কেউ কেউ ড্রেনে ও ক্যানালের মধ্যে এই ছাই ফেলে দিচ্ছে। এতে ড্রেন ও ক্যানালের পানি নির্গমনে বাঁধা সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষার সময় একটু বৃষ্টি হলেই পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তঘাট, বিদ্যালয়, বসত বাড়ি, কলকারখানা। বিশেষ করে ধানের গুড়া ও ছাইয়ের কণা বাতাসে মিশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে ওই এলাকার বাড়ি ঘর, গাছপালা, ফসল, ঘরের ভিতরের আসবাব পত্রের উপর আস্তরনের সৃষ্টি হচ্ছে।

 

মানুষের নিশ্বাসের সাথে মিশে দেহে প্রবেশ করে নানা রকম জটিল রোগের সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শিশুরা শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়াও বটতৈল থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত সড়কটিতে চলাচলকারীদের চোখে ধানের গুড়া ও ছাইয়ের কণা পড়ে দূর্ঘটনাও ঘটছে। চশমা ব্যবহার করেও এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাচ্ছেনা। ব্যাপক ভাবে ক্ষতি হচ্ছে চোখের। চাউল কল গুলোর বয়লারে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে কাঠ পোড়ানোর কারনে ব্যাপক কালো ধোয়ার সৃষ্টি হচ্ছে। যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর কার্বনডাই অক্সাইড বহন করে। প্রতিবাদ করতে কেউ এগিয়ে গেলে সে ব্যক্তিগত আক্রমণের স্বীকার হয় বলে জানা গেছে। তখন সমাজীরা মিলিত হয়ে সকল সমস্যার সমাধান না করে পক্ষপাতিত্ব করে থাকেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

 

সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত এ অঞ্চলের উপর নজর দেওয়া। তারা আরও বলেন, এ সকল সমস্যাগুলোর সমাধান করা হলে খাঁজানগর দেশের অন্যতম ক্ষুদ্র শিল্প অঞ্চল হিসেবে সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে কুষ্টিয়ার শিল্প অঙ্গনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। 

 

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক নাসরিন সুলতানা জানান, বিষয়টি আমড়া সরেজমিনে খোঁজ খবর নিয়েছি এবং আমাদের উর্দ্ধোতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা পরিবেশ অধিদপ্তর, খাদ্য অধিদপ্তর, পানি উন্নয়নসহ বোর্ড শংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন ও ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়াও কুষ্টিয়া জেলাপ্রশাসক বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছেন। এ কমিটি ৩ টি সাব কমিটি করে দিয়েছেন। তারা তাদের রিপোর্ট ইতিমধ্যেই প্রদান করেছেন। অটো চাউল কল গুলোর বিরুদ্ধে বর্জ্য, ধানের গুড়া, ছায়ের কণা এবং বয়লারের কালো ধোয়ার ভয়ংঙ্কর পরিবেশ দুষনের হাত থেকে রক্ষা পেতে খাজানগর গ্রামবাসী ও কুষ্টিয়ার সচেতন মহল ওই এলাকার ২৫ হাজার পরিবারকে দুষিত পরিবেশের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের আশুহস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর