বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলায় অবস্থিত দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও ওসি (তদন্ত)-এর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, মামলার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ, অবৈধ অর্থ আদায় এবং অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একাধিক স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর বক্তব্যে অভিযোগগুলোর মধ্যে মিল পাওয়া গেছে, যা বিষয়টির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় ঘুষ ও মামলায় প্রভাবের অভিযোগ-অভিযোগ রয়েছে, একই মামলার বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের কাছ থেকেই পৃথকভাবে অর্থ নেওয়া হয়। পরে যে পক্ষ বেশি অর্থ প্রদান করে, সিদ্ধান্ত সাধারণত তাদের পক্ষে যায় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। এমনকি চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অংকের অর্থ গ্রহণের অভিযোগও উঠেছে ওসি ও ওসি তদন্তের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কিত ঘটনা-সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় জানা যায়, একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানির ডিপো দৌলতপুর পিপুলবাড়িয়াতে সেই তামাকের ডিপোতে চাঁদাবাজি ও অনৈতিক সুবিধাভোগের অভিযোগে দৌলতপুরের এমপি রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লার ছেলে শিশির মোল্লাকে আটকে রাখে জেটিআই তামাক কোম্পানি, সেখানে দৌলতপুর থানার কর্মকর্তাগন ওসি ও ওসি তদন্ত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।
অভিযোগ আছে, এ ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছে এবং ওসি তাঁর ব্যাক্তিগত আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে। সাধারণ মানুষের হয়রানি-স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে সাধারণ মানুষকে থানায় ডেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। অর্থ ফেরত চাইলে অসহযোগিতামূলক আচরণের শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী ওসি দৌলতপুরকে প্রদানকৃত টাকা ফিরত চাইলে তিনি বলে, থানাতে এসে টাকা নিয়ে যান। আর কিছু বল্লেই থানাতে যেয়ে কথা বলতে বলেন। অবৈধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ-দৌলতপুর উপজেলার পদ্মা নদী সংলগ্ন বৈরাগীরচর ভাদু ফকিরের আস্তানার নিচ থেকে অবৈধভাবে টলিতে করে ফিলিং বালু উত্তোলনের বিষয়ে মরিচা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও মরিচা ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক এক মেম্বার ওসির রুমে গেছিলো সেদিন উক্ত ফিলিং বালু উত্তোলনের জন্য অর্থ গ্রহন করে ওসি দৌলতপুর।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন এসব কার্যক্রম থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আদায় করা হয়। এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকেই।নাম প্রকাশে আরো একাধিক ব্যাবসায়ী বলে, ভাই সামনে অনুষ্ঠান থানাতে, দৌলতপুর উপজেলার অফিসারদের নিয়ে প্রোগ্রাম হবে আপনাকে এগুলো, ওগুলো দিতে হবে। আরেকটি বিষয়, আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ-একটি জমির রিসিভার নিয়োগ সংক্রান্ত ঘটনায় আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে গোপনে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীরা দাবী করেছিলেন টাকা নিলেন ওপেন ডাক-অকশনের জন্য কিন্তু সেটা না করে মনগড়া কাজ করছেন এটা কাম্যনা। তবে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও এখনো তা ফেরত দেওয়া হয়নি। অর্থ চাইলে ওসি দৌলতপুর বলেন, থানাতে এসে টাকা নিয়ে যান। এছাড়া অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়ার অভিযোগ-অর্থের বিনিময়ে হত্যা, ডাকাতি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
সম্প্রতি দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক রবিউলের উপর পূর্ব শত্রুতার জেরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের। এমন পরিস্থিতিতে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
এছাড়া সদ্য সাবেক দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবিদ হাসান মন্টি সরকারের একটি স্ট্যাটাসে পোষ্টে-”যেদিন থেকে পুলিশের একটা ডায়লগ বন্ধ হবে, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেব! সেদিন থেকে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। মব জাস্টিস হলো শামিম, পুলিশ বলল অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাবস্থা নিব, মামলা রেকর্ড করব, মরিচায় সেচ্ছাসেবক দলের নেতার বাড়িতে এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষন হল, তাও পুলিশ বলছে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষ ব্যাবস্থা নিব।
অথচ আমার এলাকায় দুই ভাই জমি নিয়ে মারামারি, পুলিশ আরেক ভাইয়ের ছেলেকেও ধরে এনেছে, সকলে আসল আমাকে বলল সেই ছেলেটা ছিলনা। আমি লোক পাঠালাম, ওসিকে ফোন দিয়ে বললাম ভাই ছেলেটা ছিলনা ও কিছু জানেনা ওকে ছেড়ে দিয়ে, ওর বাপকে আসামি করে চালান দেন। উনি খুব উত্তেজিত হয়ে আমাকে বললেন প্রয়োজনে আমরা পুলিশ বাদি হয়ে মামলা দিব তবুও ছাড়ব না, বাপ বেটা দুজনকেই আসামি করে চালান দিলেন।
বুঝলাম ওসি সাহেবের পারসোনাল ইন্টারেস্ট। ঘটনা ঘটলেই এ্যাকশন নিতে হবে এবং পুলিশের ঘুষ খাওয়া বন্ধের কার্যকারি পদক্ষেপ নিতে হবে, তাছাড়া দেশে সুশাসন সম্ভব না। বেড়ায় ক্ষেত খাচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষ ক্ষুদ্ধ, বিরক্ত হয়ে উঠছে, দৌলতপুর আবার সন্ত্রাসের আতুড়ঘর হয়ে উঠছে। এ-র জন্য প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যাক্তি দায়ি।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত থানার কর্মকর্তা ওসি বলেন, উপরোক্ত বিষয়ে সব ভিত্তিহীন, যে টাকা গ্রহন সম্পর্কে বলেছেন, কে বলেছেন,আমি জানি, তাকেই বলেন আমার বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহন করুক।
উপস্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় স্থানীয়রা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাময়িক প্রত্যাহার, আর্থিক লেনদেন ও মামলার নথি পর্যালোচনা এবং জনগণের গোপন সাক্ষ্য গ্রহণের সুপারিশ করেছেন। দৌলতপুর থানাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।জনআস্থা পুনরুদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
