খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুন ২০২৬, ৩:৫ এএম

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। তাই কখনও তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে, কখনও চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে ছুটতে হচ্ছে সহকারী শিক্ষক মো. মিজানুর রহমানকে। এক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়তে দিয়ে যাচ্ছেন অন্য শ্রেণিতে। তিনি বেরিয়ে যেতেই সেই শ্রেণিকক্ষের শিশুরা শুরু করে হইচই। এমন বিশৃঙ্খল পাঠদানের দৃশ্য দেখা যায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ৫৩ নম্বর এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত সোমবার বেলা ৩টা ৪৫ মিনিটে উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নে অবস্থিত বিদ্যালয়ে এই চিত্র দেখা যায়। পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে দেখা যায়, চেয়ার-টেবিল ফাঁকা। শিক্ষক নেই। ব্ল্যাকবোর্ডে ইংরেজিতে সুন্দরবন বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ লেখা। একজন একজন করে শিক্ষার্থীরা বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তা দেখে দেখে পড়ছে।
এই শ্রেণির ১ নম্বর রোল সম্রাট হোসেনের। তার ভাষ্য, ‘বিদ্যালয়ে মাত্র দুইজন শিক্ষক। মিজান স্যার বোর্ডে পড়া লিখে দিয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে গেছেন। আমরা এক-এক করে উঠে দাঁড়িয়ে বোর্ড দেখে পড়ছি।’ প্রায় প্রতিদিনই এভাবে তাদের পড়তে হয় বলেও জানায় এই শিশুটি। একই শ্রেণির মোছা. নুসরাত খাতুন (রোল নম্বর-৫) বলল, ‘প্রতিদিনই স্যার অল্প পড়তে দিয়ে চলে যান। আবার ১০-১৫ মিনিট পরে আসেন। এভাবে ঠিকঠাক পড়াশোনা হচ্ছে না। আরও স্যার হলে ভালো হতো।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর দেওয়া তথ্যমতে, যেদিন প্রধান শিক্ষক থাকেন না, সেদিন একমাত্র সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমানকেই দৌড়াদৌড়ি করে এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে যেতে হয়। এতে বিদ্যালয়ে তেমন পড়াশোনা হচ্ছে না। প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আছে ১০৩ জন।
বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র দুজন। তাদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম দাপ্তরিক কাজেই ব্যস্ত থাকেন। সহকারী শিক্ষক মিজানুর রহমান একাই চালাচ্ছেন বিদ্যালয়টি। ২০২৩ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সমকালে ‘তালা খোলে খুদে শিক্ষার্থীরা, শিক্ষক আসেন ১০টার পর’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হলে সাময়িকভাবে দুই শিক্ষককে সংযুক্ত করা হয়। তারা ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিলেন। এরপর থেকে আবারও জোড়াতালি দিয়ে চলছে পাঠদান। সহকারী শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, তারা দুজন মাত্র শিক্ষক। তার মধ্যে প্রধান শিক্ষককে দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।
অধিকাংশ সময়ে তিনি একাই প্রথম শিফটের তিন ক্লাস ও দ্বিতীয় শিফটের তিন ক্লাসে পড়ান। এক ক্লাসে গেলে অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরা বসে থাকে। তাঁর ভাষ্য, কোনোদিন প্রায় ২২টি ক্লাস নেন তিনি। এক শিক্ষক দিয়ে এভাবে মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয়। অন্তত আরও দুজন শিক্ষক দরকার। শিক্ষক সংকটে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রধান শিক্ষকের অনেক দাপ্তরিক কাজ থাকে। সকাল ও বিকেলের প্রতি শিফটে তিনটি করে শ্রেণি চলে। তবুও রুটিন অনুযায়ী এক ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে দৌড়ে দৌড়ে ক্লাস নেন সহকারী শিক্ষক। এতে স্বাভাবিক পড়াশোনা হচ্ছে না। শিক্ষক নিয়োগের জন্য শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছেন। দুই শিক্ষক দিয়ে কখনও মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয় বলে মনে করেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিরাজুম মনিরা। তিনি বলেন, খুব দ্রুতই সেখানে ডেপুটেশনের মাধ্যমে শিক্ষক দেওয়া হবে। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলায় ১৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য আছে ৫০টি। সরকার জনবল নিয়োগ দিলে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য