বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের আউটসোর্সিং বা চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে কথিত নিয়োগ বাণিজ্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই অডিওতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসের বিপরীতে অর্থ লেনদেনের আলোচনা এবং রোগীদের ‘মুরগি’ বলে সম্বোধনের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি একটি ফেসবুক পেজে ৮ মিনিট ২৮ সেকেন্ডের একটি অডিও প্রকাশ করা হয়।
সেখানে দাবি করা হয়, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির এক নেতার বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আউটসোর্সিং নিয়োগে অর্থ দাবি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। ভাইরাল হওয়া অডিওতে চাকরিপ্রত্যাশীর পরিচয় গোপন রাখা হলেও অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে জাতীয় যুবশক্তির কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্য সচিব সুরুজ হোসেন সম্রাট বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অডিওটি কবে, কোথায় ও কীভাবে ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অডিওতে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “সিভি আমি যাকে দেব, সে আমার ট্রাস্টেড।
আমার ক্ষমতার কাছে তার ক্ষমতা কিছুই না। আমি এনসিপির যুব সংগঠনের জেলা সেক্রেটারি। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও আমার প্রভাব আছে।” একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, “লোক নেবে ৩৪ জন। এই নিয়োগ বের করে নিয়ে আসছি আমি। এর আগে ২৫ জনের নিয়োগও আমার মাধ্যমেই হয়েছে।” হাসপাতালের আউটসোর্সিং কার্যক্রম প্রসঙ্গে অডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “হাসপাতালে প্রচুর ইনকাম ছিল। একটি রোগীকে স্ট্রেচারে ওয়ার্ডে নিয়ে গেলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা আয় হয়। ৮ ঘণ্টার ডিউটিতে ২০টা মুরগি (রোগী) পেলে এক হাজার টাকা ইনকাম।”
অডিওতে আরও শোনা যায়, চাকরি প্রত্যাশীকে সিভি ও টাকা জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং চাকরি না হলে টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়। সেখানে দাবি করা হয়, হাসপাতালের চাকরি পেতে অনেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে ঘুরছেন এবং “সিভির সঙ্গেই এক লাখ টাকা” নেওয়া হবে। ভাইরাল অডিও প্রসঙ্গে সুরুজ হোসেন সম্রাট প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও একপর্যায়ে অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, “এনসিপির মধ্যে একাধিক পক্ষ রয়েছে। সামনে জেলা কমিটি গঠন হবে। ধারণা করছি, বিরোধী পক্ষ থেকে এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।”
অডিওতে থাকা কণ্ঠ তার কি না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আপনি যে কথাগুলো বলছেন শুনে মনে হচ্ছে এগুলো আমার কথা। আমি কাউকে বলেছিলাম।” এদিকে ভাইরাল অডিওর পর জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির প্যাডে ৩ জুন প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুষ্টিয়া জেলা শাখার কোনো অনুমোদিত কমিটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ এখনো গঠন বা অনুমোদন দেয়নি। ফলে কুষ্টিয়া জেলায় জাতীয় যুবশক্তির পক্ষে কেউ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সদস্য সচিব বা অন্য কোনো সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কেউ নিজেকে জাতীয় যুবশক্তির সাবেক সদস্য সচিব, সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা অন্য কোনো পদধারী হিসেবে পরিচয় দিলে তা “সম্পূর্ণ অসত্য, ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর” হিসেবে গণ্য হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সব কার্যক্রম, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বলে উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, এসবের দায় জাতীয় যুবশক্তি বহন করবে না। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ জনগণকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়। এ বিষয়ে জাতীয় যুবশক্তির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হোসেন বলেন, “যুবশক্তির কুষ্টিয়া জেলার কোনো কার্যকর কমিটি নেই।
এর আগে একটি খসড়া কমিটি হয়েছিল, তবে সেটি স্থগিত করা হয়। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ নিয়ে কেন্দ্র থেকে বিবৃতি দেওয়া হবে।” জানতে চাইলে এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) নয়ন আহম্মেদ বলেন, “বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ছেলেটি জড়িত ছিল—এটা অস্বীকার করছি না। সে নিজেকে যুবশক্তির নেতা হিসেবে পরিচয় দিত। বিষয়টি জানার পর কমিটি গঠনের এক ঘণ্টার মধ্যেই তা স্থগিত করা হয়। ভাইরাল অডিওর বিষয়ে তদন্ত চলছে।” ভাইরাল অডিও ও পরবর্তী কেন্দ্রীয় বিবৃতিকে ঘিরে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আউটসোর্সিং নিয়োগ প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার এবং কথিত নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
