কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান জলধর সেন: বাংলা ভ্রমণসাহিত্য ও সাংবাদিকতার দীপ্তিময় পুরুষ

বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে ভ্রমণসাহিত্য এবং সাংবাদিকতার ইতিহাসে যে কটি নাম পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, তাদের মধ্যে জলধর সেন অন্যতম। একাধারে প্রথিতযশা ভ্রমণকাহিনী লেখক, সফল ঔপন্যাসিক, প্রবীণ সাংবাদিক এবং সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলা ভাষার সেবায় আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। কুষ্টিয়ার উর্বর মাটিতে শেকড় প্রোথিত এই কৃতি সন্তান তার লেখনীর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যজগতে এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্যসাধনা এবং সাংবাদিকতা পেশায় সুদূরপ্রসারী অবদান নিয়ে একটি সুবিন্যস্ত মূল্যায়ন নিচে তুলে ধরা হলো।

জন্ম, শেকড় এবং কুষ্টিয়ার পলিমাটিতে শৈশব

কুষ্টিয়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জলধর সেনের জন্ম ও শৈশব অতিবাহিত হয়। এখানকার নদীমাতৃক পরিবেশ, গ্রামীণ জনপদের সহজ-সরল মানুষ এবং চারপাশের প্রকৃতি তার মানস গঠনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি অনুরাগ এবং চারপাশের পৃথিবীকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের এক সুপ্ত প্রবণতা ছিল তার মধ্যে। কুষ্টিয়ার সেই ঐতিহ্যবাহী জনপদ থেকে তিনি মানুষের জীবনের বৈচিত্র্য ও অনুভূতির যে প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তার সমগ্র সাহিত্যিক জীবনে তা প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।

সাহিত্যজগতে প্রবেশ এবং সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলা

উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা যখন নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন জলধর সেন সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার দুনিয়ায় প্রবেশ করেন। তিনি কেবল সৃজনশীল লেখালেখির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও সমাজ সংস্কারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রখ্যাত পত্রিকাগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি সুদৃঢ় নৈতিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তার মার্জিত গদ্যশৈলী এবং নিখুঁত শব্দচয়ন সেকালের পাঠকমহলে দারুণ সমাদৃত হয়েছিল।

ভ্রমণসাহিত্যের পথিকৃৎ ও ‘হিমালয়’ রচনা

জলধর সেনের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও ঐতিহাসিক দিক হলো তিনি ছিলেন বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অন্যতম সেরা স্রষ্টা। সেকালে সাধারণ মানুষের পক্ষে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো বা পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমণ করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ বিষয়। তিনি নিজে হিমালয়সহ দুর্গম বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করে সেখানকার নিসর্গ সৌন্দর্য, মানুষের জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির বাস্তব রূপ অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভাষায় তুলে ধরেছিলেন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হিমালয়’ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে একটি ক্লাসিক মর্যাদা লাভ করেছে। এই বইটির পাতা উল্টালে পাঠকরা যেন লেখকের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি উপত্যকা ও প্রকৃতির অপার রূপ চাক্ষুষ করার সুযোগ পান।

প্রবাস চিত্র এবং অন্যান্য মননশীল রচনা

ভ্রমণকাহিনীর পাশাপাশি জলধর সেনের অন্যান্য রচনাও বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তার রচিত ‘প্রবাস চিত্র’ এবং অন্যান্য ভ্রমণভিত্তিক ও মননশীল গ্রন্থগুলোতে ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে পারিপার্শ্বিকতার সুষম সমন্বয় দেখা যায়। তার বর্ণনার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তথ্যনিষ্ঠা এবং আবেগের সংযত প্রকাশ। কোনো রকম অতিরঞ্জিত বা কৃত্রিম অলংকার ব্যবহার না করে তিনি বাস্তবতাকে যেভাবে তুলে ধরতেন, তা পাঠকদের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করত।

‘বসুমতি’ পত্রিকা সম্পাদনা ও সাহিত্যিক পৃষ্ঠপোষকতা

সাংবাদিকতা জীবনের একটি বড় সময় জুড়ে জলধর সেন প্রখ্যাত পত্রিকা ‘বসুমতি’ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি শুধু সংবাদ পরিচালনা করেননি, বরং সেকালের উদীয়মান অনেক লেখক ও সাহিত্যিককে লেখালেখির সুযোগ দিয়ে তাদের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করেছিলেন। নতুন লেখকদের উৎসাহ দেওয়া এবং মানসম্মত সাহিত্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তার সম্পাদকীয় প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা তৎকালীন সাহিত্য অঙ্গনে তাকে এক অনন্য অভিভাবকের আসনে বসিয়েছিল।

ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা

জলধর সেনের জীবন ও কর্ম বাংলা সাহিত্য এবং সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক সোনালী অধ্যায়। কোলাহলপূর্ণ প্রচারের আলোর বাইরে থেকে তিনি নিভৃতে যে কাজ করে গেছেন, তা সময়ের পরিক্রমায় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হিসেবে তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, নিষ্ঠা এবং শ্রমের মাধ্যমে কীভাবে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তার রচিত ভ্রমণকাহিনী এবং সাংবাদিকতার আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সবসময় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
Tags :

ফিচার ডেস্ক, কুষ্টিয়া জিলাইভ

সর্বশেষ খবর