বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে কটি নাম ত্যাগের রক্তিমিমায় উজ্জ্বল, তাদের মধ্যে শহীদ গোলাম কিবরিয়া অন্যতম। কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রবীণ ও প্রভাবশালী এই রাজনীতিবিদ কেবল স্থানীয় পর্যায়ে গণমানুষের নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন জাতীয় রাজনীতির এক অবিসংবাদিত সংগঠক। কুষ্টিয়ার উর্বর মাটিতে জন্ম নেওয়া এই কীর্তিমান পুরুষ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সততা, আদর্শ ও জনসেবার ব্রত নিয়ে রাজনীতি করে গেছেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান এবং মর্মান্তিক পরিণতি নিয়ে একটি সুবিন্যস্ত ও বিস্তারিত মূল্যায়ন নিচে তুলে ধরা হলো।
Table of Contents
Toggleজন্ম, শেকড় এবং রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার বাটিকামারা গ্রামে গোলাম কিবরিয়ার জন্ম ও শৈশব অতিবাহিত হয়। এখানকার পলিমাটি, নদীমাতৃক পরিবেশ এবং তৎকালীন গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার ভেতর থেকেই তার মানস গঠিত হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিবাদী, সাহসী এবং জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। চারপাশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা এবং ব্রিটিশ বিরোধী ও স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল হাওয়া তার তরুণ মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। কুষ্টিয়ার সেই ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণ থেকেই তিনি জীবনের মূল রাজনৈতিক দর্শন খুঁজে পেয়েছিলেন।
ছাত্ররাজনীতি ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য
শিক্ষাজীবনে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজে অধ্যয়নকালে গোলাম কিবরিয়া সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল এবং নতুন নেতৃত্বের উত্থানপর্বে তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন। সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক আদর্শ ও দূরদর্শিতা তার চিন্তাধানাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে বাঙালি জাতির অধিকার আদায় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠامোর ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে তিনি এই অভিজ্ঞতার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে সংগঠক হিসেবে অবিস্মরণীয় ভূমিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং মুক্তিকামী তরুণদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গোলাম কিবরিয়ার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। তিনি ছিলেন কুষ্টিয়া অঞ্চলের অন্যতম প্রধান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। খোকসা ও কুমারখালীর মাটি থেকে সাধারণ জনতা ও যুবকদের একত্রিত করে ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং রণাঙ্গনে পাঠানোর কার্যক্রমে তিনি সর্বাগ্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। বয়সে বঙ্গবন্ধুর বড় হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু তাকে গভীর স্নেহ করতেন এবং ‘মিয়া ভাই’ বলে সম্বোধন করতেন। এই সুদৃঢ় আস্থার ফলেই কুষ্টিয়ার রণাঙ্গনে তিনি পেছনের সারিতে না থেকে সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন ও সংসদ সদস্য হিসেবে কার্যকাল
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গঠনে এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনে গোলাম কিবরিয়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান সভার অন্যতম স্বাক্ষরকারী (সিগনেটরি মেম্বার)। ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি তার এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন।
মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি
জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর এক মর্মান্তিক ও নৃশংস ঘটনার শিকার হন এই প্রবীণ নেতা। ওই দিন কুষ্টিয়ার কুমারখালী বড় জামে মসজিদ ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায়রত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে তিনি শাহাদাতবরণ করেন। তার এই আকস্মিক ও নৃশংস মৃত্যু সমগ্র কুষ্টিয়াসহ পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রাজনীতির মাঠে সততা এবং আদর্শের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের এভাবে নিভে যাওয়া তৎকালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বিরাট আঘাত হেনেছিল।
ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা
শহীদ গোলাম কিবরিয়ার জীবন ও কর্ম কেবল ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট অধ্যায় নয়; এটি ত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক অনন্য দলিল। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে তার স্মৃতিচিহ্ন এবং তাঁর নামানুসারে নির্মিত ‘শহীদ গোলাম কিবরিয়া সেতু’ আজও তার কীর্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ক্ষমতার মোহমুক্ত থেকে কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য লড়তে হয়, তিনি তা নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হিসেবে গোলাম কিবরিয়ার আদর্শ, সাহসিকতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের জন্য চিরকাল পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।






