বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবনটি ৯ বছরেও চালু করা যায়নি। জনবসতি থেকে দূরে ও দুর্গম স্থানে নির্মাণ করায় নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ভবনটি বুঝে নিতে অপারগতা জানান তৎকালীন চেয়ারম্যান। এরপর থেকে পরিত্যক্ত পড়ে আছে সরকারি অর্থে নির্মিত ভবনটি। দাপ্তরিক কার্যক্রম না চলায় এটি এখন মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে চুরি হচ্ছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ৯৭ লাখ ২৭ হাজার ১৩৮ টাকা ব্যয়ে ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ করে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজ’ কাজ সম্পন্ন করলেও বিতর্কের মুখে ভবনটি উদ্বোধনের আগেই তৎকালীন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বারী টুটুল নির্বাচনে পরাজিত হন। এরপর থেকে ভবনটি আজও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এলাকাবাসী জানান, প্রায় ১৩ হাজার লোকের বসবাস এই আমবাড়িয়া ইউনিয়নে। তাদের অভিযোগ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও বাজার সংলগ্ন জনাকীর্ণ প্রধান এলাকা এড়িয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল বারী টুটুল নিজের প্রভাব খাটিয়ে এবং এলজিইডির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে জনবসতি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিজ গ্রামে জমি কিনে এই কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন।
জমি কেনা ও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
পরবর্তীতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মিলন ভবনটির নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণ দেখিয়ে এটি বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে আজও তালা খোলেনি এই ভবনের। বর্তমানে জরাজীর্ণ পুরোনো ভবনেই ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সেবাগ্রহীতারা বলেন, মূল এলাকা থেকে তিন মাইল দূরে নতুন ভবনের চেয়ে হাতের কাছের পুরাতন ভবনই তাদের জন্য সুবিধাজনক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর ভবনটি ঘিরে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। রাত বাড়লে এলাকাটি জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং ভীতিজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় গরু-ছাগলের আস্তাবল আর বখাটেদের আড্ডায় পরিণত হওয়া এই ভবন এখন সরকারের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মিলন বলেন, ভূমি কেনা নিয়ে তখন বড় ধরনের বাণিজ্য হয়েছিল। সাধারণ মানুষের থেকে চাঁদা তুলে এবং এলাকার মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ভোটের উদ্দেশ্যে নিজ গ্রামে ভবনটি নেওয়া হয়েছিল। ভবনের নকশা ও অবকাঠামোতে অনেক ত্রুটি থাকায় এবং জননিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমি এটি গ্রহণ করিনি। এলাকার জনমানুষের সুবিধার কথা ভেবে পুরোনো ভবন সংস্কার করাটাই ছিল যৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
আমবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সোহেল রানা লিটন বলেন, বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা ও নিরাপত্তার অভাব থাকায় এখানে কার্যক্রম পরিচালনা করা কোনো চেয়ারম্যানের পক্ষেই সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের মিরপুর উপজেলার সাবেক প্রকৌশলী জহীর মেহেদী হাসান দাবি করেন, নিয়ম মেনেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে।
তবে ওই এলাকায় নিরাপত্তা সংকট যে রয়েছে, তা তিনি স্বীকার করেন। এত বছর ভবনটি কেন অকার্যকর পড়ে আছে এবং নির্মাণের সময় কেন নিরাপত্তা বা ত্রুটির বিষয়টি দেখা হয়নি- এমন প্রশ্নে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।
কুষ্টিয়ার স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক আহমেদ মাহবুব উল ইসলাম বলেন, কোটি টাকার ভবনটি কেন ব্যাবহার করা হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।









