কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান এস আই টুটুল: বাংলা সংগীত জগতের এক অনন্য নক্ষত্র

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে বহুমুখী প্রতিভা, সুরের বৈচিত্র্য এবং স্বকীয় গায়কীর জন্য যে কটি নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে এস আই টুটুল অন্যতম। ব্যান্ড সংগীত থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, সুর সংযোজনা এবং লোকসংগীতের আধুনিকীকরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত কুষ্টিয়া জেলায় শিকড় প্রোথিত এই শিল্পী তার কর্মের মাধ্যমে কেবল নিজ জেলাকেই নয়, পুরো দেশকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানিত করেছেন। বাংলা আধুনিক ও ব্যান্ড সংগীতের গতিপ্রকৃতি বদলে দেওয়া এই শিল্পীর জীবন, সাধনা ও সংগীতযাত্রা নিয়ে এক সুবিন্যস্ত ও বিস্তারিত পর্যালোচনা তুলে ধরা হলো।

জন্ম, শেকড় এবং শৈশব: কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা

কুষ্টিয়া এমন এক উর্বর ভূমি, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছে লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের মতো সাংস্কৃতিক দিকপালরা। এই ঐতিহাসিক ও সংস্কৃতির সুতিকাগারেই এস আই টুটুলের জন্ম ও প্রাথমিক জীবন অতিবাহিত হয়। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিক লোকসংস্কৃতির আবহ তার অবচেতন মনে সংগীতের বীজ বুনে দিয়েছিল। কুষ্টিয়ার ধূলিমলিন মাটি, বাউল গানের সুর এবং পদ্মার ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে থাকা আবহমান বাংলার সংস্কৃতি তার ভেতরের সুরকার ও শিল্পীকে ধীরে ধীরে রূপ দিতে সাহায্য করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সংগীতের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ তাকে খুব অল্প বয়সেই সুর সাধনার দিকে ধাবিত করে।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংগীতের প্রাথমিক পাঠ

সংগীতের প্রতি এস আই টুটুলের ঝোঁক ছিল পারিবারিক সূত্রে পাওয়া। তার পরিবারে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা ছিল নিয়মিত। শৈশবে পরিবারের উৎসাহ এবং নিজ এলাকার স্থানীয় গুণীজনদের সান্নিধ্য তাকে গান ও যন্ত্রসংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে হারমোনিয়াম, গিটার এবং কিবোর্ডের প্রতি তার সহজাত আকর্ষণ তাকে দ্রুত একজন দক্ষ বাদক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কুষ্টিয়ার সেই গ্রামীণ আবহে সুরের যে প্রাথমিক পাঠ তিনি গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীকালে তা তার পেশাদার সংগীত জীবনে বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

ব্যান্ড সংগীতের পথচলা এবং এলআরবি (LRB)-এর সঙ্গে স্বর্ণালী অধ্যায়

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের যে স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছিল, তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছেন এস আই টুটুল। দেশের অন্যতম কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ‘এলআরবি’ (Love Runs Blind)-এর সঙ্গে তার যুক্ত হওয়া বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। ব্যান্ডটির সঙ্গে দীর্ঘ সময় তিনি প্রধান কিবোর্ডবাদক, গিটারিস্ট এবং ভোকালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। আইয়ুব বাচ্চুর মতো ক্ষণজ জন্ম সংগীতশিল্পীর সান্নিধ্যে থেকে তিনি রক সংগীতের গভীরতা, স্টেজ পারফরম্যান্স এবং অডিও প্রোডাকশনের সূক্ষ্ম কারিগরি দিকগুলো রপ্ত করেন। এলআরবির বহু সুপারহিট অ্যালবামে তার শৈল্পিক অবদান ব্যান্ড সংগীতপ্রেমীদের মনে চিরজাগরূক হয়ে আছে। ব্যান্ড সংগীতের এই রূক্ষ ও শক্তিশালী ধারার পাশাপাশি তার মৃদু ও সুরময় গায়কী শ্রোতাদের মাঝে এক ভিন্ন মাত্রার আবেদন তৈরি করেছিল।

নিজস্ব ব্যান্ড ‘ধ্রুবতারা’ এবং স্বাধীন সংগীত সাধনা

এলআরবি অধ্যায় পেরিয়ে এস আই টুটুল নিজের একক সৃজনশীলতা ও স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গঠন করেন নতুন মিউজিক্যাল ব্যান্ড ‘ধ্রুবতারা’। এই ব্যান্ডের মাধ্যমে তিনি বাংলা গানে এক নতুন ধারার সূচনা করেন, যেখানে রক ও অল্টারনেটিভ মিউজিকের সঙ্গে লোকসংগীতের মেলবন্ধন ঘটানো হয়। ‘ধ্রুবতারা’-এর ব্যানারে প্রকাশিত গানগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলে। ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল ও প্রধান সুরকার হিসেবে তিনি এমন কিছু গান উপহার দিয়েছেন, যা আজও বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়। স্বাধীনভাবে কাজ করার এই সুযোগটি তাকে কেবল একজন পারফর্মার নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ সংগীত স্রষ্টা ও কম্পোজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

প্লেব্যাক সংগীত ও চলচ্চিত্রে এস আই টুটুলের অসামান্য অবদান

ব্যান্ড সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতেও এস আই টুটুল এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। চলচ্চিত্রের গানে প্লেব্যাক করার ক্ষেত্রে তার কণ্ঠের আবেগ ও বৈচিত্র্য পরিচালক ও শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে। বিশেষ করে তৌকীর আহমেদ পরিচালিত প্রশংসিত চলচ্চিত্র ‘দারুচিনি দ্বীপ’-এর জন্য তার সুর করা ও গাওয়া গানগুলো বাংলা চলচ্চিত্রের সংগীত ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। চলচ্চিত্রে তার গাওয়া প্রতিটি গানই যেন গল্পের গভীরে প্রবেশ করে দর্শকের হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। প্লেব্যাক সংগীতের ক্ষেত্রে চরিত্রের ভাব ও অনুভূতির সঙ্গে সুরের নিখুঁত সমন্বয় ঘটানোর ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

জনপ্রিয় কিছু চলচ্চিত্রের গান এবং শ্রোতাপ্রিয়তা

এস আই টুটুলের গাওয়া ও সুর করা বেশ কিছু গান বাংলাদেশের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়েছে। তার কণ্ঠে ‘যাদি গেছ তার কি উপায়’ কিংবা ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে মরতে জীবন মেশে’—এ ধরনের গানগুলো কেবল বাণিজ্যিক সফলতাই পায়নি, বরং সংগীতের গুণগত মানের দিক থেকেও অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে। তার কণ্ঠে রোমান্টিক ও বিষাদের সুর এমন এক আবহ তৈরি করে, যা শ্রোতাকে মুহূর্তের মধ্যে আবেগপ্রবণ করে তোলে। আধুনিক যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে লোকজ সুরের মিশ্রণে তৈরি এসব গান বাংলা চলচ্চিত্রের গান শোনার সংস্কৃতিকে নতুন দিক নির্দেশনা দিয়েছে।

সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে বহুমুখী প্রতিভা

কেবল একজন গায়ক বা ব্যান্ড তারকা হিসেবেই নয়, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও এস আই টুটুল অত্যন্ত সফল। তিনি অসংখ্য একক অ্যালবাম, চলচ্চিত্রের গান এবং নাটকের টাইটেল ট্র্যাকের সংগীত পরিচালনা করেছেন। তার সুরের বৈশিষ্ট্য হলো—এতে ক্লাসিক্যাল সুরের কাঠামোর সঙ্গে আধুনিক পপ ও ফিউশনের এক অপূর্ব সমন্বয় থাকে। নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পীকে তিনি নিজের সুর ও তত্ত্বাবধানে গান রেকর্ডিংয়ে সুযোগ করে দিয়েছেন, যা তরুণ প্রতিভাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সুরের বৈচিত্র্য এবং স্বকীয়তা বজায় রাখার কারণে তার কম্পোজিশনগুলো সহজেই সাধারণ শ্রোতা থেকে শুরু করে সংগীত সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

লোকসংগীত ও আধুনিকতার মেলবন্ধন: এস আই টুটুলের গায়কী শৈলী

কুষ্টিয়ার সন্তান হওয়ায় বাউল ও লোকসংগীতের শিকড় এস আই টুটুলের রক্তে প্রবাহিত। তিনি যখন আধুনিক রক বা পপ গান গান, তখনো তার গায়কীতে মাটির টান ও লোকসংগীতের ফ্লেভার টের পাওয়া যায়। বাংলার বাউল গানগুলোকে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে ফিউশন করে নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। প্রাচীন লোকজ বাণীর সঙ্গে আধুনিক ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমের এই সেতুবন্ধন বাংলা সংগীত জগতকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তার গলার যে ন্যাচারাল ভাইব্রেশন এবং এক্সপ্রেশন, তা যেকোনো সাধারণ গানকেও অসাধারণ করে তুলতে সক্ষম।

পুরস্কার, সম্মাননা এবং জাতীয় স্বীকৃতি

দীর্ঘ সংগীত জীবনে এস আই টুটুল তার অসামান্য অবদানের জন্য বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সুরকার ও প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে একাধিক prestigious অ্যাওয়ার্ড। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান হিসেবে তিনি কেবল নিজের জেলার সম্মানই বাড়াননি, বরং জাতীয় সংস্কৃতি অঙ্গনে নিজেকে এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেশ ও দেশের বাইরে অসংখ্য স্টেজ শোতে অংশগ্রহণ করে তিনি বাংলা গানকে বিশ্বমঞ্চের শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করেছেন।

বাংলা সংগীতে এস আই টুটুলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও উত্তরাধিকার

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এস আই টুটুলের ভূমিকা কেবল একজন জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়, তিনি এক চলমান অনুপ্রেরণা। নব্বইয়ের দশকের রক সিন থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের ফিউশন ধারা—সব জায়গাতেই তার শৈল্পিক উপস্থিতি বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করেছে। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে তিনি যেভাবে আধুনিক বাংলা সংগীতকে বিশ্বমানের করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য একটি বড় পথপ্রদর্শক। একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগীতসাধক হিসেবে এস আই টুটুলের নাম বাংলা সংগীতের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
Tags :

ফিচার ডেস্ক, কুষ্টিয়া জিলাইভ

সর্বশেষ খবর