মোশারফ হোসেন ॥ কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন ভ্যান হারিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মো. মোশারফ হোসেন (৬১)। ভ্যানটি চুরির পর থেকে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। তাঁর বৃদ্ধ মা ও অসুস্থ স্ত্রীর ঔষুধ কেনা এবং সংসারের খরচ চালানো দুর্বিশাহ হয়ে পড়ে এমন খবর প্রকাশের পর দেশ ও দেশের বাহিরে থেকে অনেকেই তাকে সাহায্যের জন্য পাশে দাড়িয়েছেন। গতকাল রোববার (১৪ জুন) দুপুরে উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তাকে একটি নতুন ভ্যান তুলে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার।
মোশারফ কুমারখালী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া এলাকার বাসিন্দা। বৃদ্ধ মা নবিরন নেছা ও অসুস্থ স্ত্রী আলেয়া খাতুনকে নিয়ে চলে তার সংসার। মোশারফ কুমারখালী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠপাড়া এলাকার বাসিন্দা। সংসারে তাঁর বৃদ্ধ মা নবিরন নেছা ও অসুস্থ স্ত্রী আলেয়া খাতুন রয়েছেন। জানা গেছে, গত ২ জুন উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া বড় জামে মসজিদের সামনে ভ্যানটি রেখে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে যান। নামাজ শেষে বের হয়ে দেখেন, তাঁর ভ্যানটি চুরি হয়ে গেছে। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানের সন্ধান না পেয়ে ৩ জুন কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
এর পর তাকে নিয়ে ৬ জুন বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। মূহুর্তেই সংবাদটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সাহেদ নামের আমেরিকান প্রবাসী ১২ হাজার টাকা, উপজেলা যুবদলের আহবায়ক জাকারিয়া আনছার মিলন ১০ হাজার টাকা এবং হামদর্দ ল্যাবরেটরীজ (ওয়াক্ফ) বাংলাদেশের সিনিয়র পরিচালক, সমাজসেবক অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এক লাখ টাকা মানবিক সহায়তা করেন। তারমধ্যে ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তাকে একটি নতুন ভ্যান তৈরি করেন মোশারফ। এ বিষয়ে উপজেলা যুবদলের আহবায়ক জাকারিয়া আনছার মিলন বলেন, ভ্যান হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন বৃদ্ধ চালক।
এমন সংবাদটি দেখে চালক মোশারফকে এন আই আনছার ফাউন্ডেশের উদ্যোগে ১০ হাজার টাকা মানবিক সহায়তা করা হয়। অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুনের প্রতিনিধি তকি উদ্দিন মোহাম্মদ আকরাম বলেন, কামরুন নাহার ম্যামের নজরে আসলে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরবর্তীতে তাকে এক লাখ টাকা মানবিক সহযোগীতা করা হয়েছে। তারমধ্যে একটি নতুন ভ্যান তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, খয়েরচারা বাজার – ফুলতলা সড়কের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করেন মোশারফ। বাড়ির সামনের সড়কে নতুন ভ্যানটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা – ছেলে। নতুন ভ্যান পেয়ে তাঁরা আবেগ আপ্লুত। এ সময় বৃদ্ধ মা নবিরন কাঁন্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ ছেলে ভ্যানডা হারিয়ে খুব টেনশনে ছিল। কয়ডা দিন শাক – পাতা তুলে খায়ছি। আপনারা ভ্যানডা দিছেন, খুশি হয়ছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করব।’
স্ত্রী আলেয়া খাতুন বলেন, কয়ডা দিন কত সমস্যায় ছিলাম। মাথায় একটু তেলও নিতি পারিনি। সগলে মিলে ভ্যানডা দিছেন। এখন আবার কর্ম করে খাতি পারবনে। খুব খুশি হয়ছি আমরা।’ আবেগ আপ্লুত হয়ে প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক মোশারফ হোসেন বলেন, নামাজ পড়তে গিয়ে ভ্যান চুরি হয়েছিল। সবজাগা ঘুরাঘুরি করেও ভ্যান পাইনি। এদেশে কতবড় লোক আছে কেউ দেখিনি। এরপর খবরে দিলি পরে কামরুন নাহার, মিলন ভাই ও একজন বিদেশ থেকে মেলা গুলো টাকা দিছে। একখান ভ্যান বানায়ছি। চাল, ডাল, ওষুধ, তরিতরকারি কিনিছি। এখন আল্লাহ দিলি ভ্যানডা চালায় আবার কর্ম করে খাবনে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, মোশারফের পাশে অনেক মানবিক সহযোগীতা নিয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগৃহীত অর্থে একটি নতুন ভ্যান আজ তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সহযোগীতাকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সমাজের সকল অসহায় ও দুস্থদের পাশে বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।









