মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী ॥ অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও জনকল্যাণকর স্থানে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর কয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী ভবন নির্মাণে তদন্তে নেমেছে প্রশাসন। গতকাল বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে চার সদস্য বিশিষ্ট কমিটি সরেজমিন তদন্ত শুরু করেছেন। তদন্ত কমিটি প্রায় দুই ঘণ্টার অধিক সময় ধরে পরিষদের নামে প্রস্তাবিত তিনটি স্থানের কাগজপত্রাদি যাচাই-বাছাই, জনগণের মতামত ও গুরুত্ব বিচার-বিশ্লেষণ করে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড রায়ডাঙা মৌজায় ২৫ শতাংশ, ৭ নম্বর ওয়ার্ড সুলতানপুর মৌজায় একটি পুরাতন ভবনসহ ৩০ শতাংশ এবং ৬ নম্বর ওয়ার্ড বাড়াদী মৌজায় ৫০ শতাংশ জমি রয়েছে পরিষদের নামে। কিন্তু আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তিন গ্রামবাসীর মধ্যে বিরোধের জেরে ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী কার্যালয় নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। দ্রুত একটি নির্দিষ্ট স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের দাবি জানান তারা। জানা গেছে, ১৯৬৩ সালে কয়া ইউনিয়নের সুলতানপুর এলাকায় ৩০ শতাংশ জমির ওপর দুই কক্ষবিশিষ্ট পরিষদ ভবন নির্মাণ করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান সোনা মিয়া। সেখানে তিনি পাঁচ বছর পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পরবর্তী দুই চেয়ারম্যান ময়েন উদ্দিন ১০ বছর এবং সালাউদ্দিন ৫ বছর সেখানে কার্যক্রম চালান। এর পর আমিরুল ইসলাম আমু চেয়ারম্যান হলে তিনি সুলতানপুর থেকে সরিয়ে পরিষদের কার্যক্রম তাঁর নিজ বাড়ি ঘোড়াই ঘাট এলাকায় নিয়ে যান। তবে বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেনের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের নির্দিষ্ট কোনো কার্যালয় ও ভবন নেই। যিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন তাঁর বাড়িই পরিষদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত বানিয়াপাড়া এলাকার আলী হোসেনের বাড়িতে চলছিল পরিষদের কার্যক্রম। তবে প্রশাসনের নির্দেশে চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি থেকে সুলতানপুর এলাকার পুরাতন জরাজীর্ণ ভবনে শুরু হয়েছে কার্যক্রম। তবে সেখানে পর্যাপ্ত কক্ষের অভাবে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে, প্রতিষ্ঠার ৬২ বছরেও নির্দিষ্ট ঠিকানা মেলেনি ইউনিয়ন পরিষদের। তিন গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের নামে জমি থাকলেও নিজস্ব ভবন নেই। যখন যিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, তাঁর বাড়িই পরিণত হয় পরিষদের কার্যালয়ে। এতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ১ নম্বর কয়া ইউনিয়নের অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। ফলে উপযুক্ত স্থান নির্ধারণের জন্য ১ জানুয়ারি চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে উপজেলা প্রশাসন। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মা ও গড়াই নদীর কূলঘেঁষে অবস্থিত কয়া ইউনিয়ন।
এই ইউনিয়নেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিপ্লবী বাঘা যতীন, অবিভক্ত বাংলার প্রথম শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী মৌলভী শামসুদ্দিন আহমেদ, শহীদ আবরার ফাহাদ, শহীদ ইয়ামিনসহ অনেকেই। সেখানে স্থায়ী পরিষদের ভবন নির্মাণের জন্যে তদন্ত করছেন তদন্ত কমিটির আহবায়ক ও কুমারখালী সহকারী কমিশনার ( ভূমি) নাভিদ সারওয়ার, কমিটির সদস্য উপজেলা হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা শামছুল হুদা, উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. কাওছার আলী ও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব কামরুল ইসলাম শাওন। সেখানে ভিড় করেছেন উৎসুক জনতা। এ সময় রায়ডাঙা মৌজার বাসিন্দারা জানান, সুলতানপুর এলাকায় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য। নিরাপত্তা নেই। সেখানে চলাচলের জন্য পরিষদের নামে পথ নেই। অপরদিকে বাড়াদী এলাকার জমিতে মামলা রয়েছে। নেই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। অপরদিকে, কয়া ইউনিয়নের প্রধান সড়ক ঘেঁষে রায়ডাঙা মৌজা।
এখানে রয়েছে ভূমি অফিস, সরকারি ব্যাংক, কলেজ, স্কুল মাদ্রাসাসহ বিপ্লবী বাঘা যতীন ও শহীদ আবরার ফাহাদের বসতভিটা। সুতরাং এখানে পরিষদের ভবন নির্মাণ হলে সবদিক থেকেই অধিক মানুষের উপকার হবে। বাড়াদী মৌজার বাসিন্দারা বলছেন, সুলতানপুর সন্ত্রাসী প্রবণ এলাকা। প্রায় সংঘর্ষ ও চুরি, ডাকাতি, লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পুলিশ হত্যার মতো ঘটনাও রয়েছে। আর রায়ডাঙা মৌজাটি ইউনিয়নের এককোণে অবস্থিত। অপরদিকে বাড়াদী এলাকাটি ইউনিয়নের মাঝখানে অবস্থিত। সুতরাং এখানে ভবন হলেই মানুষের কল্যাণ হবে। তবে জমিতে মামলা আছে কি না? এমন বৈধ কাজগপত্রাদি দেখাতে পারেননি। আর সকল অভিযোগ অস্বীকার করে সুলতানপুর মৌজার বাসিন্দারা বলছেন, বাড়াদী ও রায়ডাঙার জমিতে মামলা চলছে। ওই স্থান গুলোতে পরিষদ হলে এলাকা ভিত্তিক সেবা পাবে মানুষ। আর সুলতানপুর হলো ইউনিয়নের মাঝখানে অবস্থিত।
এখানে পুরাতন পরিষদ ভবন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কৃষি ভবন রয়েছে। সুতরাং এখানেই স্থায়ী ভবন নির্মাণ হলে সকল শ্রেণির জনগণের কল্যাণ হবে। চেয়ারম্যান মো. আলী হোসেন বলেন, তিনটি গ্রামে ইউনিয়ন পরিষদের নামে জমি থাকলেও গ্রামবাসীর ঠেলাঠেলিতে ভবন নির্মাণ হয়নি। এতে জনসাধারণ পরিষদের স্বাভাবিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জনস্বার্থে উপযুক্ত স্থানে ভবন নির্মাণের জন্য ইউএনওকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহবায়ক ও কুমারখালী সহকারী কমিশার ( ভূমি) নাভিদ সারওয়ার বলেন, পরিষদের নামে প্রস্তাবিত তিনটি স্থান পরিদর্শন করে স্থানীয়দের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। স্থানীয় জনসাধারণের সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি মাথায় রেখে খুব দ্রুতই কমিটি প্রতিবেদন প্রদান করবে।
