কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স
প্রকাশ: ১৫ই আগস্ট ২০২৬, ১:৩৭ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গেলে বিত্তিপাড়া বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে পিচঢালা গ্রামীণ সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার গেলেই বিত্তিপাড়া গ্রাম। সেখানে চোখে পড়বে কৃষি বিভাগের বড় একটি সাইনবোর্ড। তাতে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সারের নানা উপকারিতা ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন তথ্য লেখা আছে। গ্রামের ভেতরে গেলে বাড়ির আঙিনায় চোখে পড়বে সারি সারি সিমেন্টের চাক পাতা।
এসব চাকে উৎপাদন করা হয় কেঁচো সার। বিত্তিপাড়া গ্রামের শতাধিক গৃহবধূ এই সার উৎপাদনে যুক্ত। কিছু সার নিজ জমিতে ব্যবহার করেন। বাড়ির আঙিনায় ফলান বেগুন, ঝিঙে, লাউসহ নানা রকম সবজি। বাদবাকি সার ঘরে বসেই বিক্রি করেন। তাতে বাড়তি আয় হয়। ধীরে ধীরে তারা হয়ে ওঠেন স্বাবলম্বী।
বিত্তিপাড়া গ্রামের গৃহবধূ জাহানারা খাতুন, সালেহা খাতুন, রেবেকা খাতুন, হাসিনা খাতুন, আছিয়া খাতুন, রিনা পারভীন, হাসনা খাতুন, নিলুফা ইয়াসমীন, নবীরন খাতুন, আরজিনা খাতুন, মনিরা খাতুন, কমেলা খাতুন, সুভা খাতুন, হাসিয়া খাতুন, আয়েশা খাতুন, ছবিরুন্নেসা, সালমা খাতুন, পারুলা খাতুন, রহিমা বেগম, রাশিদা খাতুনসহ শতাধিক নারী এখন উদ্যোক্তা। এই গ্রামে জৈব সার তৈরি প্রথম শুরু করেন জাহানারা খাতুন। ২০২১ সালে দুটি চাক বসান বাড়ির আঙিনায়।
সেখানে গোবর ও কেঁচো রেখে তৈরি করেন জৈব সার। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিসে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেখান থেকে কারিগরি সহযোগিতা নেন। এখন বাড়ির পেছনে টিনশেডে ৪০টি চাক বসিয়েছেন। বাড়ির সামনে আরও ১০টি চাক আছে। নিজের গরুর গোবর ছাড়াও গ্রামের অনেক বাড়ি থেকে গোবর সংগ্রহ করেন। তাতে যুক্ত করেন সবজির উচ্ছিষ্ট। মেশান কলাগাছের বাকল। প্রতিটি চাকে সার হয় ৩০ কেজি।
সফল উদ্যোক্তা জাহানারা সমকালকে জানান, সিমেন্টের তৈরি প্রতিটি চাক কেনেন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। সেখানে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট, কলাগাছের বাকল ফেলেন। শুরুর দিকে কৃষি অফিস থেকে সংগ্রহ করা কেঁচো দেন। এখন অবশ্য নিজেদের সংগ্রহেই কেঁচো আছে। এরপর চাকটি ঢেকে রাখা হয় ২০ থেকে ২৫ দিন। মাঝেমাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। এভাবে জৈব সার তৈরি হয়। এরপর চালুনিতে চেলে ছোট ছোট প্যাকেট বা বস্তায় ভরে বিক্রি করেন।
প্রতি মাসে প্রায় ৪০ মণ জৈব সার উৎপাদন করছেন। প্রতি কেজি সার বিক্রি হয় ১৫ টাকায়। এই হিসাবে প্রতি মাসে ২৪ হাজার টাকার সার উৎপাদন করেন। নিজেরা ব্যবহার করেন দুই থেকে তিন মণ। অবশিষ্ট সার বিক্রি করেন। বিভিন্ন এলাকার কৃষক মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাড়ি এসে এই কেঁচো সার কিনে নিয়ে যান। জাহানারা খাতুন আরও বলেন, ‘কেঁচো সারেই আমাদের জীবন বদলে গেছে। কয়েক বছর আগেও বাড়িতে ছাপড়া ছিল। সেখানে দালান তুলেছি। গরু-ছাগল পালছি। সামান্য জমি আছে। সেখানে যা ধান হয়, তা দিয়ে আমাদের চলে যায়। তা ছাড়া বাড়ির আঙিনায় শাকসবজি ফলাই। সরকারি নানা সহযোগিতা পেয়ে এতদূর এসেছি। আমার দেখাদেখি গ্রামের অনেক নারী এখন জৈব সার তৈরি করছেন। তারাও স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।’
রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীন বলেন, ‘বিত্তিপাড়া গ্রামে সবজি ও অন্যান্য ফসলের আবাদ হয়। জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করছেন নারীরা। প্রথমত নিজেদের ফসলের জমিতে এই সার ব্যবহার করা হয়। বাড়তি সার বিক্রি করে কিছু টাকা আয় হয়। সংসারের কাজে লাগে। মনিরা জানান, তাদের গ্রামের বাসিন্দারা আগের তুলনায় এখন কম রাসায়নিক সার ব্যবহার করছেন। তারা জৈব সার ব্যবহার করে বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ নানা সবজি ফলাচ্ছেন। ধান, ভুট্টা ও শসা ক্ষেতেও জৈব সার ব্যবহার করছেন। রহিমা বেগম ও রাশিদা খাতুন জানান, কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন নিয়মিত তাদের খোঁজ-খবর রাখেন। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছেন।
বাড়িতে এসেও নারীদের জড়ো করে নানা পরামর্শ দেন। এতে গ্রামের নারীরা অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন। এসব উদ্যোক্তা নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জৈব সার বিক্রির টাকায় তারা সন্তানদের লেখাপড়া, স্কুল ড্রেস তৈরিসহ পরিবারের নানা প্রয়োজন মেটান। শখের অনেক জিনিসও কিনছেন। কেঁচো সার তৈরিতে তেমন খরচ নেই। পরিশ্রম নেই বললেই চলে। এসব কারণে দিন দিন এই গ্রামের নারীরা কেঁচো সার তৈরিতে এগিয়ে আসছেন। এই সার তাদের বাড়তি আয়ের উৎস। বিত্তিপাড়া ব্লকে দায়িত্বরত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, ‘পুরুষেরা অনেক সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। কিন্তু নারীরা বাড়িতে থেকে নানা কাজ করেন।
তাই জৈব সার উৎপাদনের জন্য নারীদের বেছে নেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে সুবিধা পাওয়ায় নারীরা এখন নিজেরাই জৈব সার উৎপাদন করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এখন তারা এই সারের উপকারিতা বিষয়ে সচেতন।’ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন বলেন, ‘আমি একজন নারী। এতে নারীদের সঙ্গে মিশতে সহজ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমি ও আমার টিমের সদস্যরা নারীদের কী প্রয়োজন সেটা জেনে মেটানোর চেষ্টা করছি। পাশাপাশি নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এই গ্রামে একজন থেকে শুরু করে এখন শতাধিক নারী জৈব সার উৎপাদন করছেন। এটাই আমাদের জন্য বড় সাফাল্য।’
রুপালী খাতুন আরও বলেন, ‘প্রণোদনা ও সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। প্রায় প্রতি বাড়িতে বস্তায় সবজি উৎপাদনের জন্য নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছ বিতরণ করা হচ্ছে। নারীরা যাতে জৈব সার ব্যবহার করে নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে পারেন এবং এই সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন, সে জন্য আমাদের এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য