বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থায় বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের অবদান ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই জনপদের মাটি যুগে যুগে এমন অসংখ্য ক্ষণজন্মা প্রতিভার জন্ম দিয়েছে, যাঁরা দেশমাতৃকার ক্রান্তিলগ্নে নিজেদের মেধা, শ্রম ও সাহসিকতার মাধ্যমে জাতির ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশগ্রামের কৃতি সন্তান এডভোকেট এম. এ. বারী এমনই একজন বহুমাত্রিক ও আলোকিত ব্যক্তিত্ব।
সত্তরের দশকের উত্তাল ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে একাত্তরের রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, পরবর্তীতে স্বাধীন দেশের সর্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী এবং একজন মননশীল লেখক—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় দেশপ্রেম ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক অনন্য মেলবন্ধন।
Table of Contents
Toggleজন্মস্থান ও শেকড়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী বাঁশগ্রামে এডভোকেট এম. এ. বারীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। ঐতিহাসিকভাবেই কুমারখালী অঞ্চলটি শিক্ষা, সাহিত্য ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক চর্চার এক উর্বর চারণভূমি। এমন একটি সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রসর ও রাজনৈতিক সচেতন পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং সমকালীন রাজনৈতিক শোষণ তাঁকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ব্রতী হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
সত্তরের দশকের ছাত্র রাজনীতি ও নেতৃত্বের বিকাশ
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে ১৯৭০-এর দশক একটি অত্যন্ত সন্ধিক্ষণ। আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের পতন, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন এবং অসহযোগ আন্দোলনের সেই উত্তাল রাজনৈতিক পটভূমিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে।
এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের সময় কুমারখালী ও বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলে ছাত্রসমাজকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে এম. এ. বারী একজন অগ্রণী ছাত্রনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কেবল রাজপথের স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে, তিনি তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাধিকার আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার মতো জটিল সাংগঠনিক দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংগঠনিক ভূমিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, তাঁদের পাশাপাশি নেপথ্যে থেকে যারা যুবসমাজকে সংগঠিত করেছেন এবং জনমত তৈরি করেছেন, তাঁদের ভূমিকা কোনো অংশেই কম নয়। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে এম. এ. বারী সেই ঐতিহাসিক দায়িত্বটি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
কুমারখালী ও বাগুলাট অঞ্চলে জনমত গঠন
২৫শে মার্চের কালরাতের পর যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশব্যাপী হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন কুষ্টিয়ায় স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এই প্রতিরোধকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপ দিতে স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয় ছিল অপরিহার্য।
- তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণ: বাগুলাট ও কুমারখালী অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত করেন।
- প্রশিক্ষণ ও সমন্বয়: স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করে সীমান্ত পার হয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো এবং রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক লজিস্টিক সহায়তা প্রদানে তিনি এক অকুতোভয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।
আইন পেশায় আত্মনিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্টে পদচারণা
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। এই পর্যায়ে এম. এ. বারী রাজপথের রাজনীতি থেকে সরে এসে প্রাতিষ্ঠানিক আইন চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।
আইন পেশায় তাঁর মেধা, সততা ও একাগ্রতা তাঁকে খুব দ্রুতই সফলতার শিখরে পৌঁছে দেয়। তিনি দেশের সর্বোচ্চ আইনি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী (Advocate) হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করেন। সুপ্রিম কোর্টে তাঁর দীর্ঘ পেশাগত জীবনে তিনি কেবল আইনি সেবাই প্রদান করেননি, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের অধিকার নিশ্চিতে একজন ন্যায়নিষ্ঠ আইনজ্ঞ হিসেবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন।
লেখক সত্তা ও ঐতিহাসিক দলিল ‘Memoirs Of A Blood Birth’
একজন সফল আইনজীবী এবং সাবেক ছাত্রনেতার পরিচয়ের বাইরে এডভোকেট এম. এ. বারীর আরেকটি উজ্জ্বল পরিচয় হলো তাঁর লেখক সত্তা। ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পটভূমি তিনি তাঁর লেখনীতে অত্যন্ত সুচারুভাবে ধারণ করেছেন।
তাঁর রচিত স্মৃতিকথাভিত্তিক ইংরেজি গ্রন্থ ‘Memoirs Of A Blood Birth’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস এবং আত্মজৈবনিক রচনার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। ঢাকার স্বনামধন্য ‘বাণীমহল প্রকাশনী’ থেকে এই মূল্যবান গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও জাতীয় স্বীকৃতি
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে ‘মাইক্রো-হিস্ট্রি’ বা প্রান্তিক পর্যায়ের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এম. এ. বারীর এই গ্রন্থটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ নয়; এটি কুষ্টিয়া অঞ্চলের স্বাধিকার সংগ্রাম, স্থানীয় প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের এক প্রামাণ্য দলিল।
বইটির বস্তুনিষ্ঠতা এবং ঐতিহাসিক মূল্যের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হলো, এটি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ গ্রন্থাগার (Bangladesh Parliament Library)-এর বিশেষায়িত ‘মুক্তিযুদ্ধ কর্নার’-এ একটি প্রামাণ্য ইতিহাস গ্রন্থ হিসেবে তালিকাভুক্ত ও সংরক্ষিত হয়েছে। এটি লেখকের জন্য যেমন পরম সম্মানের, তেমনি কুষ্টিয়াবাসীর জন্যও এক বিশাল গৌরবের বিষয়।
নতুন প্রজন্মের জন্য আদর্শিক উত্তরাধিকার
বাঁশগ্রামের মতো একটি নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে মেধা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের জোরে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করার যে দৃষ্টান্ত এডভোকেট এম. এ. বারী স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই বিরল। সত্তরের দশকের রাজপথের সাহসী ছাত্রনেতা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দূরদর্শী সংগঠক, সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস রচয়িতা—তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য শিক্ষণীয় উপাদান।






