খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুন ২০২৬, ৩:১৮ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে বিএনপির রাজনীতি যখন অনেকটাই নিস্তেজ। মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও যখন প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না, ঠিক তখনই দলীয় নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে স্থানীয় বিএনপি। মিরপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার টিপু সুলতানের এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে দেখা দিয়েছে দলীয় মতবিরোধ
তাঁর বক্তব্যের জের ধরে সংবাদ সম্মেলন করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও কুষ্টিয়া-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ করার আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও মিরপুর-ভেড়ামারা বিএনপিতে এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। গত ৩০ মে শনিবার বিকেলে মিরপুর উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার টিপু সুলতান।
বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরীর পরাজয়ের পেছনে অধ্যাপক শহীদুল ইসলামের ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে তিনি নির্বাচনের সময় অর্থ লেনদেন এবং ভোট কেনাবেচার অভিযোগও উত্থাপন করেন।তবে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। এ কারণে বক্তব্যটি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
টিপু সুলতানের বক্তব্যের পরপরই বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম। তিনি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগকে ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, ওর মতো একজন নেতা কী বলল, তাতে বিএনপির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না। একই সঙ্গে তিনি কুষ্টিয়া-২ আসনের বিএনপির সাবেক প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী এবং সাবেক সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের নাম উল্লেখ করে বলেন, দলের ভেতরে বিভক্তি সৃষ্টি হলে তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফলে বিষয়টি ব্যক্তিগত মতপার্থক্যের গণ্ডি পেরিয়ে স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও নেতৃত্বের প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মিরপুর-ভেড়ামারা বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক বলয় ও নেতৃত্বকেন্দ্রিক অবস্থান নিয়ে আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের পর সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে যদি দলীয় নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন, তাহলে তা কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক লড়াইয়ের পরিবর্তে যদি দলের ভেতরে ‘কে বিশ্বাসঘাতক, কে অনুগত’—এই বিতর্কই প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে সাংগঠনিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়বে।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও একাধিক তৃণমূল নেতা-কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় বিএনপির বর্তমান সংকট রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়; বরং পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। তাঁদের ভাষায়, “যখন সবাই বেইমান খোঁজার রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকে, তখন সংগঠন শক্তিশালী হওয়ার পরিবর্তে দুর্বল হয়ে পড়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মিরপুর-ভেড়ামারা এলাকায় বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যাশিত গতি দেখা যায়নি। বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কর্মসূচি সীমিত হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নেতৃত্বের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ দলীয় কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দলীয় কোন্দল ও পারস্পরিক অভিযোগ। পর্যবেক্ষকদের মতে, মিরপুর-ভেড়ামারা বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সাংগঠনিক ঐক্য ফিরিয়ে আনা। তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়ে একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে না পারলে ভবিষ্যতের যেকোনো নির্বাচনী লড়াই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, “দলকে শক্তিশালী করতে হলে আত্মসমালোচনা প্রয়োজন, কিন্তু তা যদি ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে রূপ নেয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সংগঠনই।
ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—মিরপুর-ভেড়ামারা বিএনপি কি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব কাটিয়ে সাংগঠনিক ঐক্যের পথে ফিরতে পারবে, নাকি ‘ঈমানদার আর বেইমান খোঁজায় ব্যস্ত’—এই অভিযোগই হয়ে উঠবে আগামী দিনের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়। মিরপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার টিপু সুলতান বলেন, “আমি বর্তমানে একটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করছি। তাই এ মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা সম্ভব হচ্ছে না। পরে সুযোগ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব।
ভেড়ামারা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম আলম বলেন, এ বিষয়ে ৩০ মে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম তার অবস্থান ও বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। দিন শেষে আমরা সবাই বিএনপির কর্মী ও সমর্থক। দলের দুঃসময়ে যারা ত্যাগ, শ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, তারাই ভবিষ্যতে দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। রাজনীতিতে সুবিধাবাদীদের অবস্থান কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অতীতেও আমরা এমনটি দেখেছি, বর্তমানেও তার ব্যতিক্রম নয়। ৫ আগস্টের পর অনেকেই বিএনপির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছেন।
তবে দলের কঠিন সময়ে যারা পাশে ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, নেতৃত্বের মূল দায়িত্ব তাদের হাতেই থাকবে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কুতুব উদ্দিন বলেন, এই বিষয় নিয়ে আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে বসেছিলাম এবং একটি বিহিত করা হয়েছে। এটি নিতান্তই একটি সাংগঠনিক বিষয়, তাই আমরা সাংগঠনিকভাবেই বিষয়টির সমাধান করেছি। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐক্যের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে আমাদের কিছু নীতিমালা এসেছে। আমরা সেই নীতিমালার আলোকে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে, একক অবস্থানে থেকে এবং পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মোকাবেলা করব।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য