খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুলাই ২০২৬, ১:২১ এএম

ওয়াসিফ আল আবরার, ইবি প্রতিনিধি ॥ দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ। প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ চার বছর দেওয়া হলেও দীর্ঘ ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। কবে তা শেষ হবে তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৮ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় যার মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের অনুমোদনের পর দু’দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পর ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয় ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে সেই সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি প্রকল্পের নির্মাণকাজ। এ অবস্থায় চতুর্থ দফায় আবারও মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ২০১৮ সালে অনুমোদিত এই মেগাপ্রকল্পের আওতায় আবাসিক হল ও একাডেমিক ভবনসহ ৯টি ১০ তলা ভবন এবং ১১টি ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়।
নতুন ভবনের মধ্যে দু’টি ছাত্র ও দুটি ছাত্রী হল, একটি একাডেমিক ভবন, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য একটি করে নতুন ভবন, দ্বিতীয় প্রশাসন ভবন এবং তৎকালীন শেখ রাসেল হলের দ্বিতীয় ব্লক নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। এছাড়া ১১টি ভবনের সম্প্রসারণের মধ্যে রয়েছে দ্বিতীয় প্রশাসন ভবন, মীর মোশাররফ হোসেন একাডেমিক ভবন, ব্যবসা প্রশাসন অনুষদ ভবন, রবীন্দ্র-নজরুল কলা ভবন, দ্বিতীয় ডরমিটরি, পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া ভবন, চিকিৎসাকেন্দ্র, প্রভোস্ট কোয়ার্টার, টিএসসিসি, বিশ্ববিদ্যালয় ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচ তলার নতুন ভবন ও পুরোনো ভবনের সম্প্রসারণ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নির্মাণাধীন ভবন।
এছাড়াও পানি সমস্যা দূরীকরণে মেগা প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ ও রেইন ওয়াটার হারভেস্ট প্ল্যান্ট এবং বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে দুটি ৫০০ কেভি বৈদ্যুতিক সাব স্টেশন, সোলার প্যানেল স্থাপনও এ প্রকল্পের অধীনে রয়েছে। প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, মেগা প্রকল্পের অনুমোদন ২০১৮ সালের জুন মাসে হলেও এর কাজ শুরু হয় ২০২১ সালের জুলাই মাসে। কাজ শুরুর কিছুদিন পর নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় নির্মাণাধীন ৯টি ১০ তলা ভবনের মধ্যে আটটির কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দফায় দফায় চিঠি দেওয়ার কয়েক মাস পর কাজে ফেরে ঠিকাদাররা।
২০২২ সালে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সে সময় সার্বিক কাজের অগ্রগতি ছিলে মাত্র ৩২ শতাংশ। ২০২২ সালে এর মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১ বছর বাড়িয়ে ২০২৩ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। কাজ শেষ করতে না পারায় দ্বিতীয় দফায় আরও ১ বছর বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়। তখন প্রকল্পের অগ্রগতি ছিলো মাত্র ৬০ শতাংশের মতো। দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বৃদ্ধির পরে ৯টি ১০ তলা ভবনের কাজ শেষ না হলেও ভবন সম্প্রসারণের কাজগুলো শেষ করে ঠিকাদাররা। মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ার কারণ হিসেবে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময় লাগা, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ, প্রশাসনে রদবদল এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রকল্পের অনুমোদনের সময়কার দামের কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাইশা কন্সট্রাকশন লিমিটেডের সাইট ইঞ্জিনিয়ার মুন্না বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারলেও আমরাও স্বস্তি পাই কিন্তু আমরা প্রয়োজনমতো সব পাচ্ছি না। এখন জিনিসপত্রের দাম কয়েক গুণ বেশি, আমরা যে কাজে হাত দেই সেটাতেই লোকসান গুনতে হয়। তাছাড়া মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য না রেখেই মেয়াদ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের সাথে আমাদের প্রতিষ্ঠানের মিটিং হয়েছে, জনবল সংকটটা আগামী সপ্তাহেই কেটে যাবে।
আমরা চেষ্টা করছি এবছর ডিসেম্বরের মধ্যেই হলের নির্মাণ কাজ শেষ করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. নওয়াব আলী বলেন, প্রকল্পের প্রস্তাবনা আসে ২০১৮ সালে। সরকারি পর্যায়ে প্রকল্প অনুমোদন হতেই দুবছর লেগে যায়। কাজ শুরু হওয়ার পর ২০২০ সালের করোনা মহামারীর কারণে টেন্ডার পেতে প্রায় আরও দেড় বছর বিলম্ব তৈরি হয়। প্রথমে ১৪ এর রেট শিডিউল অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় ছিলো ৪৯৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পরবর্তীতে ১৮ রেট শিডিউল অনুযায়ী প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বেড়ে ৫৩৭ কোটি ৭ লক্ষ টাকা নির্ধারিত হয়। এসব কাজে অনেকটা সময় চলে গেছে। এছাড়া, ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে কাজে ধীর গতি বাড়তে থাকে।
তবে নতুন প্রশাসনের নির্দেশ রয়েছে এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যেই অবশিষ্ট কাজ শেষ করার। সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী এ. কে. এম শরীফ উদ্দিন বলেন, সম্পূর্ণ প্রকল্পের ৭৫% শেষ হয়েছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে আমরা কাজ শেষ করতে পারছি না। কয়েকটি হলের কাজ একক ভাবে ৯৫% শেষ হয়েছে। যতটুকু বাকি রয়েছে তার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। আশা করছি, উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা কাজ শেষ করতে পারবো।
এদিকে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান প্রকল্পসমূহের কাজ গুণগতমান অক্ষুন্ন রেখে সরকারি বিধি-বিধান মেনে নির্ধারিত সময়ে শেষ করার জন্য জোর নির্দেশ প্রদান করেছেন ইবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. এম মতিনুর রহমান। গত ১২ই জুলাই বিকেলে ভিসি অফিসের সভাকক্ষে চুক্তিবদ্ধ ঠিকাদারদের সাথে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি এই নির্দেশনা দিয়েছেন। সভায় উপস্থিত ঠিকাদাররাও কবে নাগাদ নির্মাণ কাজ শেষ করবেন তারা, তার একটি সময়সীমা উল্লেখ করেছেন। যদি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঠিকাদাররা কাজ শেষ না করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নিয়েছে ইবি প্রশাসন।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য