খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ই জানুয়ারি ২০১৫, ৩:৩৮ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার কুষ্টিয়া জেলা কেবল বাউল সম্রাট লালন শাহের একতারা কিংবা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুঠিবাড়ির জন্যই অনন্য নয়, এর আরেকটি বড় পরিচয় রয়েছে। এটি এদেশের শিল্প ও বাণিজ্যের এক অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় চারণভূমি। গড়াই ও পদ্মার অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জেলায় বৃহৎ, মাঝারি, ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের এক সুবিশাল অবকাটামো রয়েছে। কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের নথি এবং শিল্প খাতের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই জেলাজুড়ে রয়েছে ১৫টি বৃহৎ শিল্প, ৩৮টি মাঝারি শিল্প, ৫,২১২টি ক্ষুদ্র শিল্প এবং ২১,৮৩৭টি কুটির শিল্প। এই সুবিশাল সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে শত বছরের ঐতিহ্য, ভাঙা-গড়ার খেলা আর একদল উদ্যোমী মানুষের নিরলস শ্রমের গল্প।
কুষ্টিয়ার শিল্পায়নের কথা উঠলেই সবার আগে যে নামটি ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে ভেসে ওঠে, তা হলো মোহিনী মিলস। দীর্ঘকাল ধরে কুষ্টিয়া অঞ্চলটি তার ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের জন্য সারা দেশে বিখ্যাত ছিল। কুমারখালীর এলিঙ্গি গ্রামের কৃতি সন্তান মোহিনী মোহন চক্রবর্তী (১২৪৫-১৩৭৯ বঙ্গাব্দ) কুষ্টিয়া শহরে প্রথমে ‘‘চক্রবর্তী অ্যান্ড সন্স’’ নামের একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে, ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়া এলাকায় একশ বিঘা জমির ওপর তিনি নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মোহিনী মোহন মিলস অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি সুবৃহৎ বস্ত্রকল।
মাত্র আটটি তাঁত নিয়ে এই কাপড়ের কলের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু কাপড়ের গুণগত মানের কারণে এটি দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং একপর্যায়ে ৫৩৭টি তাঁতের এই বিশাল কারখানায় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক-কর্মচারী দিনরাত কাজ করতেন। এই মিলের তৈরি ধুতি ও শাড়ি তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তানে মানুষের অত্যন্ত প্রিয় ও আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এটিকে ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার মিলটিকে জাতীয়করণ করে পুনরায় চালু করে। তবে দুর্ভাগ্যবশত, ক্রমাগত লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে ১৯৮২ সালে এই ঐতিহাসিক মিলটি চিরতরে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মিলটি আজ বন্ধ হলেও কুষ্টিয়ার মানুষের আবেগে মোহিনী মিলসের নাম আজও জড়িয়ে আছে।
কুষ্টিয়ার শিল্প ইতিহাসের সাথে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। ১৮৮১ সালে রাজশাহী জেলার লক্ষণহাটিতে ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানি ছোট আকারে একটি কৃষি সরঞ্জাম তৈরির কারখানা গড়ে তুলেছিল। পরবর্তীতে ১৮৯৬ সালে কুষ্টিয়ার বর্তমান মিলপাড়াতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর মিলে ‘টেগোর অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে কৃষি সরঞ্জাম ও আখ মাড়াইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম অংশীদার বা মালিক ছিলেন।
পরবর্তীতে এই কোম্পানিরই দূরদর্শী প্রকৌশলী উইলিয়াম রেণউইক কুষ্টিয়ায় অনুরূপ একটি বড় কারখানা নির্মাণ করেন, যা ‘রেণউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৪১ সালে এটি একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত এর প্রধান কার্যালয় ছিল কলকাতায়। দেশবিভাগের পর মিস্টার দেশাই নামের একজন মাদ্রাজ অঞ্চলের শিল্পপতি এটি কিনে নেন। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার এটিকে জাতীয়করণ করে। এই প্রাচীন কারখানায় মূলত আখ মাড়াইয়ের আধুনিক কল, লোহার কড়াই, নলকূপ, চালের কল, গমের কল এবং তেলের কলের অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়, যা দেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নে এক বিশাল অবদান রেখে চলেছে।
কুষ্টিয়ার মাটি ও জলবায়ু আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ১৮৩০ সালে শিলাইদহ এলাকায় আধুনিক পদ্ধতিতে প্রথম চিনি উৎপাদনের একটি কারখানা স্থাপন করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবং আখের বিপুল ফলনকে কাজে লাগাতে ১৯৬৫ সালে কুষ্টিয়া শহরের জগতি এলাকায় সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘কুষ্টিয়া সুগার মিলস লিমিটেড’। এই চিনিকলটির দৈনিক আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা ১,৫২৪ মেট্রিক টন এবং দৈনিক চিনি উৎপাদনের ক্ষমতা প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন। এই মিলটি চালু হওয়ার পর থেকে কুষ্টিয়া ও এর আশেপাশের হাজার হাজার আখ চাষির অর্থনৈতিক ভাগ্য বদলে যায়।
আধুনিক বাংলাদেশের শিল্প খাতের এক বিস্ময়কর সাফল্যের নাম ‘বি আর বি কেবলস’। কুষ্টিয়া জেলার কৃতী সন্তান মো. মজিবর রহমান ১৯৭৯ সালের ২৩ অক্টোবর কুষ্টিয়া বিসিক শিল্পনগরীতে নিজেদের সামান্য পুঁজি এবং পূবালী ব্যাংকের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিআরবি (বজলার রহমান এবং ব্রাদার্স) কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’।
নব্বইয়ের দশকে যখন গোটা দেশে বিদ্যুতায়নের এক বিশাল প্রসার ঘটে, তখন এই দূরদর্শী উদ্যোক্তা কেবল উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। ১৯৯৬ এবং ২০০০ সালে তিনি কারখানায় জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত বিশ্বের আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে এর ব্যাপক সম্প্রসারণ করেন। আজ বি আর বি কেবলসের তৈরি আন্তর্জাতিক মানের বৈদ্যুতিক তার ও তারজাত পণ্য দেশের সিংহভাগ চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানসহ বিশ্বের বহু দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই কারখানায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তৈরি হয় ঘরের ভেতরের পিভিসি তার, অল অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাক্টর, অ্যালুমিনিয়াম কন্ডাক্টর স্টিল রিইনফোর্সড, আগুন প্রতিরোধী বিশেষ কেবল এবং সুপার এনামেল্ড কপার ওয়্যার। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘গোবি ইন্টারন্যাশনাল’ পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক জরিপে বিআরবি কেবল ইন্ডাস্ট্রিজ বিশ্বের শীর্ষ কেবল উৎপাদনকারী শিল্পগুলোর মধ্যে ৩৩তম স্থান অধিকার করে কুষ্টিয়া তথা পুরো বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে।
মো. মজিবর রহমানের হাত ধরেই কুষ্টিয়ার শিল্প খাতে আরও দুটি বড় প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়। ১৯৯০ সালের ৮ অক্টোবর তিনি তাঁর পিতা কিয়াম উদ্দিনের স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কিয়াম মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’। এই কারখানায় তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের আধুনিক তৈজসপত্র, নন-স্টিক রান্নার সামগ্রী এবং প্রেসার কুকার আজ দেশের প্রতিটি গৃহিণীর রান্নাঘর জয় করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘এমআরএস ইন্ডাস্ট্রিজ’। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কুষ্টিয়া অঞ্চলের প্রায় ১৫০০-এর বেশি মানুষের স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিসিক শিল্পনগরী বাংলাদেশের অন্যতম একটি লাভজনক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিসিক এলাকা হিসেবে সমাদৃত। এই বিসিক এলাকা ছাড়াও কুষ্টিয়া টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, ইস্টার্ন ফেব্রিক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং বুলবুল টেক্সটাইল লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এই অঞ্চলের বস্ত্রশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। এছাড়া বিশ্ববিখ্যাত ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) এবং দেশীয় খাতের অন্যতম বৃহৎ নাসির টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বড় বড় প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এই কুষ্টিয়াতেই অবস্থিত, যা সরকারের রাজস্ব আদায়ে বিশাল ভূমিকা রাখছে।
কুষ্টিয়ার এই ধোঁয়া ওঠা কলকারখানা, রাইস মিল আর কাপড়ের খটখট শব্দ কেবল অর্থনীতির চাকা সচল রাখেনি, বরং বাউল মাটির মেহনতি মানুষকে দিয়েছে এক স্বাবলম্বী জীবন। একতারার আধ্যাত্মিক সুরের পাশাপাশি কুষ্টিয়ার কারখানার যান্ত্রিক সুরটিও আজ তাই সমানভাবে ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবের।
মন্তব্য