কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

তৃণমূলের রাজনীতিতে কোন্দল ও গ্রুপিংয়ের জাল: বিভক্ত আওয়ামী লীগ এবং উপজেলা নির্বাচনের নতুন সমীকরণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তৃণমূল আওয়ামী লীগে নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে অন্তর্কোন্দল ও বিভেদের দেয়াল। বিশেষ করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অংশগ্রহণের কারণে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে মেরুকরণ ও মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়েছিল, আসছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তা আরও নতুন ও জটিল মাত্রা পাচ্ছে। অতীতে যেসব এলাকায় দলীয় রাজনীতিতে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা মনান্তর ছিল না, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেখানকার নেতাকর্মীরাও আজ পরস্পরের প্রতিপক্ষ বা চক্ষুশূল হয়ে উঠছেন।
নির্বাচনী বৈরিতার এই আগুনে ঘি ঢালছেন কোনো কোনো এলাকার দলীয় সংসদ সদস্য (এমপি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা, যারা নিজ নিজ এলাকায় নিজেদের একক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বজায় রাখতে মরিয়া। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন গত জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত সাবেক এমপি ও স্বতন্ত্র হিসেবে পরাজিত প্রার্থীরাও; তারাও দলের ভেতর নিজেদের আলাদা প্রভাব বলয় ও কোটারি টিকিয়ে রাখতে নানা কৌশল কষছেন। ফলে দেশের প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ‘দলীয় এমপি বনাম স্বতন্ত্র এমপি’ অথবা তাদের অনুসারীদের মধ্যকার জম্পেশ লড়াই সর্বসমক্ষে চলে এসেছে।
সাধারণত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের পুরোনো বিরোধ ও ক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার কথা থাকলেও এবারের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় নেতাকর্মীরা পরিষ্কার দুই বা ততোধিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পৃথক পথে হেঁটেছেন। কোথাও কোথাও এই বিরোধ কেবল মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে গড়িয়েছে রক্তারক্তি, হামলা, মামলা এবং খুনাখুনির মতো চরম ও নির্মম সংঘাতের দিকে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এখনও অব্যাহত থাকা এই বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক সহিংসতায় তৃণমূলের সাধারণ নেতাকর্মী ও সমর্থকরা চরম অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
দলের নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ নেতারাও তৃণমূলের এই ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেছেন। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, বর্তমানে যে হারে নতুন নতুন গ্রুপ তৈরি হচ্ছে, তার কোনো হিসাব নেই। যেসব অঞ্চলে অতীতে কখনোই রাজনৈতিক বিরোধের নামগন্ধ ছিল না, সেখানেও এখন গ্রুপিংয়ের রাজনীতি শুরু হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মতো দলেরই নেতাকর্মীদের ঘায়েল করা হচ্ছে। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এই দ্বন্দ্বকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের মতে, দলের ভেতরে ভুল বোঝাবুঝি ও হাঙ্গামা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং সংঘাতের মাত্রা কমছে না। তবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে রাজশাহী সিটি মেয়র ও দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন জানান, আসন্ন ঈদের পর তৃণমূলের ধারাবাহিক সম্মেলন শুরু হবে, যার মাধ্যমে স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার দূরত্ব ও বরফ গলানো সম্ভব হবে।
গৃহদাহের এই আগুন নেভাতে এবং তৃণমূলের এই ভাঙন রোধ করতে ইতিমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু হয়েছে। ঈদ পরবর্তী সময়ে এসব সংগঠনের নতুন সম্মেলন আয়োজন এবং দেশজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দলকে পুনর্গঠন ও গতিশীল করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের।

ঢাকা বিভাগীয় চিত্র

রাজধানী ও এর আশেপাশের জেলাগুলোতেও কোন্দলের চিত্র বেশ প্রকট। কিশোরগঞ্জ সদর ও হোসেনপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ বহুধা বিভক্ত; এখানে ডা. সৈয়দা জাকিয়া নুর লিপি এমপির সঙ্গে তাঁর ভাই এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ শাফায়াতুল ইসলামের বিরোধ কিছুতেই কমছে না। মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া অঞ্চলে পরিবেশ উত্তপ্ত হওয়ার পেছনে নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র এমপি ফয়সাল আহমেদ বিপ্লবকে দায়ী করছেন, যেখানে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট মৃনাল কান্তি দাসের অনুসারীরা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। ঢাকা-৪ আসনে স্বতন্ত্র এমপি ড. আওলাদ হোসেন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি অ্যাডভোকেট সানজিদা খানমের নেতৃত্বে দুটি পৃথক গ্রুপিং সক্রিয়।
ঢাকা-৫ আসনে স্বতন্ত্র এমপি মশিউর রহমান মোল্লা সজলের সঙ্গে যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনর রশীদ মুন্না ও স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুল হাসান রিপনের দূরত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। ঢাকা-১৪ আসনের এমপি মাইনুল হোসেন খান নিখিলও স্বস্তিতে নেই, কারণ এখানে ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সাবেক সভাপতি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবিনা আক্তার তুহিনের আলাদা একটি শক্তিশালী বলয় রয়েছে। ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র এমপি খসরু চৌধুরীর সঙ্গে সাবেক এমপি হাবিব হাসান বলয়ের দ্বন্দ্ব চলছে। সাভারে দলীয় এমপি সাইফুল ইসলাম, সাবেক এমপি ডা. এনামুর রহমান এনাম এবং সাবেক এমপি তালুকদার মোহাম্মদ তৌহিদ জং মুরাদের নেতৃত্বে স্থানীয় রাজনীতি ত্রিমুখী ভাগে বিভক্ত।
ধামরাইয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও এমপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি আবদুল মালেক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাদ্দেস হোসেনের দূরত্ব সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গাজীপুর সদর ও শ্রীপুরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি ইকবাল হোসেন সবুজ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুমানা আলী টুসির মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। কালীগঞ্জে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানো সংরক্ষিত আসনের এমপি মেহের আফরোজ চুমকির বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আখতারউজ্জামান চুমকি নিজস্ব বলয় গড়ে তুলছেন।
নরসিংদী সদরে দলীয় এমপি লে. কর্নেল (অব.) নজরুল ইসলাম হিরু বীরপ্রতীক এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান কামরুলের সমর্থকদের বিভাজন আরও গভীর হয়েছে। মনোহরদী-বেলাবতে শিল্পমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নূরুল মজিদ মাহমুদের বিরুদ্ধে পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলেও সাবেক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম খান বীরুকে ঘিরে যেকোনো সময় বড় ধরণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসনে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ এবং যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের মধ্যকার ঐতিহ্যবাহী রেষারেষি একটুও কমেনি।
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র নির্বাচন করা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কাবির মিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। মাদারীপুর সদর ও কালকিনিতে সাবেক এমপি ড. আবদুস সোবহান মিয়া গোলাপের হারের পর বর্তমান এমপি তাহমিনা বেগমকে ঘিরে নতুন মেরুকরণ হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় চিত্র

কুমিল্লা-২ আসনে সাবেক এমপি সেলিমা আহমাদ মেরী এবং স্বতন্ত্র এমপি অধ্যক্ষ আবদুল মজিদের দ্বন্দ্বের জেরে হোমনা-মেঘনার নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত এবং মেরী পক্ষের দাবি নতুন এমপির অনুসারীরা তাদের ওপর হামলা ও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লা-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সরকার বিজয়ী হওয়ার পর সাবেক এমপি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। দেবিদ্বারে স্বতন্ত্র এমপি আবুল কালাম আজাদ ও সাবেক এমপি রাজী মোহাম্মদ ফখরুলের বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ২০-২৫ গ্রামের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও পাল্টাপাল্টি মামলা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে বর্তমান এমপিকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
কুমিল্লা-৬ আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহার ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি আনজুম সুলতানা সীমার শীতল সম্পর্কের প্রভাব সিটি নির্বাচনসহ দলীয় কর্মসূচিতে স্পষ্ট পড়েছে। চান্দিনায় ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত এমপির বিরুদ্ধে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুনতাকিম আশরাফ টিটু সক্রিয় রয়েছেন। চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ও শাহরাস্তিতে এমপি মেজর জেনারেল (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তমের সঙ্গে স্থানীয় সাধারণ সম্পাদক গাজী মাঈনুদ্দিনের বিরোধ তুঙ্গে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এমপি মামুনুর রশীদ কিরণের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মিনহাজ আহমেদ জাবেদ এবং লক্ষ্মীপুরে এমপি আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হাবিবুর রহমান পবনের দূরত্ব রয়েছে। এছাড়া রায়পুরে এমপি নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন এবং সদরে এমপি গোলাম ফারুকের সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের মনমালিন্য বজায় রয়েছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় নতুন এমপি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সাবেক এমপি সামশুল হক চৌধুরীর সখ্য নেই। সাতকানিয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল মোতালেব সাবেক এমপি আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভীকে হারালেও দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। বাঁশখালীতেও সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর সঙ্গে মুজিবুর রহমান এমপির দূরত্ব কাটছে না। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে এমপি শাহীন আক্তার চৌধুরী ও টেকনাফ উপজেলা সভাপতি নুরুল বশরের দ্বন্দ্ব চরমে।

রাজশাহী বিভাগীয় চিত্র

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমপি ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল ও শিবগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলামের দ্বন্দ্বের পাশাপাশি গোমস্তাপুর ও নাচোলেও জেলা সভাপতি ও এমপি জিয়াউর রহমান এবং গোমস্তাপুর উপজেলা সভাপতি গোলাম মোস্তফার বিরোধ তীব্র। নওগাঁ-৩ আসনে নতুন এমপি সৌরেন্দ্র নাথ চক্রবর্ত্তীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এমপি ছলিম উদ্দিন তরফদার সেলিমের দূরত্ব আকাশচুম্বী। মান্দায় স্বতন্ত্র এমপি এস এম ব্রুহানী সুলতান মাহমুদ গামার সঙ্গে দলের কর্মীদের মতবিরোধ কাটছে না। নওগাঁ-৫ আসনে এমপি ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জন এবং পৌর সভাপতি দেওয়ান ছেকার আহমেদ শিষার দূরত্বে অভ্যন্তরীণ বিবাদ থামছে না।
রাজশাহীতে মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নতুন রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাজশাহী-৪ আসনের নতুন এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ ও সাবেক এমপি প্রকৌশলী এনামুল হকের বিরোধ স্পষ্ট। নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় শহিদুল ইসলাম বকুল এমপি এবং সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদের বলয়ে নেতাকর্মীরা বিভক্ত; গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রামেও সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী এমপি, সাবেক প্রয়াত এমপি আবদুল কুদ্দুস ও জাহিদুল ইসলামের অনুসারীদের ত্রিমুখী বিভক্তি রয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় চিত্র

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে স্বতন্ত্র এমপি রেজাউল হক চৌধুরী ও সাবেক এমপি আ কা ম সরওয়ার জাহান বাদশার বিরোধ চলছে। সবচেয়ে সহিংস রূপ নিয়েছে কুষ্টিয়া-৪ আসনে; যেখানে দলীয় মনোনীত ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ ও স্বতন্ত্র বিজয়ী প্রার্থী আবদুর রউফ চৌধুরীর দ্বন্দ্বে খোকসা ও কুমারখালীতে গত তিন মাসে দুটি খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং জর্জ অনুগতদের ওপর হামলা-মামলা বাড়ায় জেলা নেতৃত্ব বিরোধ নিরসনে কড়া অবস্থান নিয়েছে।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর ও মহেশপুরে সাবেক এমপি শফিকুল আজম খান চঞ্চল এবং নতুন এমপি সালাহ উদ্দিন মিয়াজীর দূরত্ব রয়েছে। যশোর সদরে এমপি কাজী নাবিল আহমেদ ও সদর সভাপতি মোহিত কুমার নাথের বিরোধের পাশাপাশি অভয়নগর ও বাঘারপাড়ায় পৃথক বলয় সক্রিয়। খুলনার ফুলতলা ও ডুমুরিয়ায় মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপির সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের মতবিরোধ এবং রূপসায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে। সাতক্ষীরার কলারোয়া ও তালায় দুই উপজেলা সভাপতির দ্বন্দ্বে দলীয় শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগীয় চিত্র

বরগুনা-১ আসনে স্বতন্ত্র এমপি গোলাম সরোয়ার টুকু বিজয়ী হলেও সাবেক এমপি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু বলয়ের নেতাকর্মীরা তাঁকে মেনে না নেওয়ায় বামনা, পাথরঘাটা ও বেতাগীতে তিনটি আলাদা গ্রুপ সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং নির্বাচনের পর পাথরঘাটায় অসংখ্য হামলা হয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফলে উপজেলা সভাপতি ও এমপি আ স ম ফিরোজের বিরুদ্ধে মোতালেব হাওলাদার ও জিয়াউল হক জুয়েলের সমর্থকরা একাট্টা থাকায় এখানকার সহিংস বিরোধে অতীতে ছয় নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
কলাপাড়া ও রাঙ্গাবালীতে বর্তমান প্রতিমন্ত্রী মহিব্বুর রহমান মহিব ও সাবেক এমপি মাহবুবুর রহমান তালুকদারের দ্বন্দ্বে প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোণঠাসা করার অভিযোগ রয়েছে। পিরোজপুর সদর ও নেছারাবাদে সাবেক এমপি আ আবদুল আউয়াল ও এমপি শ ম রেজাউল করিমের পক্ষের লড়াই থামছে না। বরিশালে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ভাই সিটি মেয়র আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ও প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীমের নেতৃত্বে নতুন বলয় তৈরি হলেও চাচা-ভাতিজা মেয়র খায়ের ও সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
পঙ্কজ দেবনাথ এমপি ও হাসানাতপন্থিদের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে সম্প্রতি জামাল মাঝি হত্যাকাণ্ডে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বাকেরগঞ্জে নৌকার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র করা উপজেলা সভাপতি শামসুল আলম চুন্নুর পক্ষ নেওয়ায় হাসানাতপন্থিরা কোণঠাসা হয়েছেন।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় চিত্র

শেরপুর সদরে সাবেক এমপি আতিউর রহমান আতিক ও স্বতন্ত্র এমপি ছানুয়ার হোসেন ছানুর দ্বন্দ্বে দল দুই ধারায় বিভক্ত। ময়মনসিংহ সদরে মোহিত উর রহমান শান্ত এবং আমিনুল হক শামীমের দ্বন্দ্বে সৃষ্ট বিরোধ সিটি নির্বাচনে গড়ালে মেয়র ইকরামুল হক টিটু ও এমপি শান্তর সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ফুলবাড়িয়ায় সাবেক এমপি মোসলেম উদ্দিনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন বর্তমান এমপি আব্দুল মালেক সরকার। ত্রিশালে সাবেক এমপি হাফেজ রুহুল আমীন মাদানীর পরাজয়ের পর উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী মারধর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ভালুকায় স্বতন্ত্র এমপি আব্দুল ওয়াহেদ ও সাবেক এমপি কাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ধনুর অনুসারীরা মুখোমুখি অবস্থানে। নেত্রকোনার আটপাড়া ও কেন্দুয়ায় স্বতন্ত্র এমপি ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু ও সাবেক এমপি অসীম কুমার উকিলের অনুসারীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সিলেট বিভাগীয় চিত্র

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও তাহিরপুরে রনজিত চন্দ্র সরকার এমপি এবং সাবেক এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের বলয় সক্রিয়। ছাতক ও দোয়ারাবাজারে এমপি মহিবুর রহমান মানিক ও শামিম আহমেদ চৌধুরীর দ্বন্দ্বে পুলিশকে রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়তে হয়েছে। হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জে সাবেক এমপি আবদুল মজিদ খানের সমর্থকরা নতুন এমপি ময়েজ উদ্দিন শরীফ রুয়েলকে মেনে নিতে পারছেন না। মৌলভীবাজার-৩ আসনে স্থানীয় নেতারা জয়ী এমপি জিল্লুর রহমানকে মেনে চলছেন না। সিলেট জেলা ও মহানগর রাজনীতিতে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীর সংবর্ধনা এবং ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘাতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

রংপুর বিভাগীয় চিত্র

পঞ্চগড়-১ আসনে সভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন ও সাধারণ সম্পাদক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ার সাদাত সম্রাটের দূরত্ব রয়েছে। দিনাজপুর-১ আসনে স্বতন্ত্র বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে সাবেক এমপি মনোরঞ্জন শীল গোপালের এবং মিঠাপুকুরে স্বতন্ত্র এমপি জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে রাশেক রহমানের দূরত্ব নতুন বলয় তৈরি করেছে। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাবেক সভাপতি ও এমপি আবুল কালাম আজাদ এবং মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর বিরোধের পাশাপাশি ফুলছড়ি-সাঘাটাতেও এমপি মাহমুদ হাসান রিপন ও ফারজানা রাব্বী বুবলির দূরত্ব কমছে না।
তৃণমূলের এই সর্বগ্রাসী কোন্দল ও গৃহদাহের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা ধরে রাখা এবং সংগঠনকে সুসংহত করা বর্তমান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর