খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০১৫, ১:৯ পিএম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গঙ্গা অববাহিকায় অবস্থিত কুষ্টিয়া জেলা কেবল সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যই সমৃদ্ধ নয়, বরং দেশের বৃহৎ শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একাধিক মেগা প্রকল্প বা বৃহৎ উন্নয়ন উদ্যোগ কুষ্টিয়া এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বাস্তবায়িত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখানকার বৃহৎ প্রকল্পগুলোর ভূমিকা অনন্য।
কুষ্টিয়া জেলা ও এর আশপাশের অঞ্চলে মূলত দুটি বৃহৎ ও ঐতিহাসিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প রয়েছে, যা দীর্ঘকাল ধরে দেশের কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রকল্প দুটি হলো:
গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প (সেচ প্রকল্প): ১৯৫৪ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পটি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম সেচ প্রকল্প।
ভেড়ামারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রসমূহ: ভেড়ামারা উপজেলায় অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত), যা দেশের জ্বালানি চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করে থাকে।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প বা জি-কে প্রকল্প (Ganges-Kobadak Irrigation Project) বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থার রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। অবিভক্ত বাংলার কৃষি অর্থনীতিকে খরা ও অনাবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা এবং ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর লক্ষ্যে এই প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়।
প্রাথমিক জরিপ ও অনুমোদন: ১৯৫১ সালে এই প্রকল্পের ওপর প্রাথমিক ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক জরিপ পরিচালিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকার প্রস্তাবিত জি-কে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে।
নির্মাণ ও বাস্তবায়ন: ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছর থেকে এই প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়। গঙ্গা নদীর পানি পাম্পের মাধ্যমে তুলে খাল বা ক্যানেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার এক বিশাল প্রকৌশলী কর্মযজ্ঞ এখানে সম্পন্ন হয়।
উৎপাদন শুরু ও সম্প্রসারণ: ১৯৬২-৬৩ কৃষি মৌসুমে প্রকল্পভুক্ত এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পানি সরবরাহ শুরু হয় এবং স্থানীয় কৃষকরা উন্নত জাতের ধান চাষে উদ্বুদ্ধ হন।
সংস্কার ও আধুনিকায়ন: দীর্ঘ সময় কার্যক্রম চলার পর ১৯৮৪ সালে পানি সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং ক্যানেল ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য একটি ব্যাপক সংস্কার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যা ১৯৯৩ সালে সফলভাবে সমাপ্ত হয়।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের কার্যক্রম শুধু কুষ্টিয়া জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সুফল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোট ৪টি জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষিজমিতে বিস্তৃত। প্রকল্পভুক্ত জেলা ও উপজেলাগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
কুষ্টিয়া জেলা (৫টি উপজেলা): কুষ্টিয়া সদর, কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা এবং দৌলতপুর (এলাকাভিত্তিক বিস্তার)।
চুয়াডাঙ্গা জেলা (২টি উপজেলা): চুয়াডাঙ্গা সদর এবং আলমডাঙ্গা।
ঝিনাইদহ জেলা (৩টি উপজেলা): ঝিনাইদহ সদর, হরিণাকুণ্ডু এবং শৈলকূপা।
মাগুরা জেলা (২টি উপজেলা): মাগুরা সদর এবং শ্রীপুর।
কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
১৯৭৬ সালে ভেড়ামারা অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রকল্প ও কেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যা পরবর্তীতে জাতীয় গ্রिडের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।
গঙ্গা নদীর নিকটবর্তী হওয়ায় এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও লালন শাহ সেতুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলের পাশে অবস্থিত হওয়ায় ভেড়ামারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা।
কুষ্টিয়ার এই বৃহৎ অর্থনৈতিক ও প্রকৌশলগত প্রকল্পের পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই জেলায় রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী (শিলাইদহ) এবং বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইজির মাজার। একদিকে আধুনিক সেচ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, অন্যদিকে রবীন্দ্র-লালনের লোকদর্শন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে কুষ্টিয়া আজ বহুমুখী পরিচয়ে পরিচিত।
কুষ্টিয়া জেলায় প্রধানত ২টি বৃহৎ উন্নয়নমূলক প্রকল্প রয়েছে—গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং ভেড়ামারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
১৯৫৪ সালে পাকিস্তান সরকারের আমলে জি-কে সেচ প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয় এবং ১৯৫৪-৫৫ অর্থবছর থেকে কাজ শুরু হয়।
জি-কে সেচ প্রকল্পের আওতায় মোট ৪টি জেলা (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও ঝিনাইদহ) এবং ১৩টি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভেড়ামারাতে অবস্থিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জ্বালানি উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
১৯৮৪ সালে জি-কে প্রকল্পের ব্যাপক সংস্কার কাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৩ সালে তা সফলভাবে সমাপ্ত হয়।
মন্তব্য