ঢাকা অফিস ॥ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই মামলায় দলটির কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে হানিফকে প্রসিকিউশনের প্রথম অভিযোগের এক থেকে ছয় নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া প্রথম অভিযোগের এক থেকে ছয় নম্বর কাউন্টে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় সদর উদ্দিন, আজগর ও আতাউর রহমানকে আমৃত্যু সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তারা।
সাজাপ্রাপ্ত চার নেতার স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এসব সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলার চার আসামিই পলাতক। তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, জহিরুল আমিনসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় চার নেতার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে হানিফের উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়, অভিযোগে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তৃতীয়, অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় চার নেতার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হানিফ। এসব বৈঠক বা সভায় দেওয়া তার উসকানিমূলক বক্তব্যকে সমর্থন করেন তিনি। এছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমনে হত্যা-নির্যাতনের উসকানি, প্ররোচনা-সহায়তা দেন এই শীর্ষ নেতা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন হানিফ। ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে অবস্থান ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা কার্যকর করার সিদ্ধান্তেও তার সমর্থন ছিল। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের হত্যাসহ গুরুতর আহত করার ঘটনায় তার উসকানি ও সহায়তা ছিল।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হানিফের নেতৃত্বে সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী, আতাউর রহমান আতাসহ অন্য নেতারা বৈঠক করেন। বৈঠকে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেন হানিফ।
প্রসিকিউশন জানায়, ওই বৈঠকে বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর বল প্রয়োগ, গুলি চালানো, হত্যা ও নির্যাতনের উসকানি এবং সহায়তা দেওয়া হয়। এ অভিযোগে হানিফ ছাড়াও সদর উদ্দিন, আজগর ও আতার নাম রয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নিয়ে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজপথে নামেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। সকাল ১০টার দিকে হাজারও ছাত্র-জনতা শহরের হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে চৌড়হাস থেকে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হানিফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের ছত্রচ্ছায়া দেয় পুলিশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে গুলি চালান তারা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল চারটার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের প্রায় ৫০ গজ উত্তরে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা হরিপুরগামী সড়কে আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এসব হত্যাকাণ্ডে হানিফ, সদর উদ্দিন, আজগর ও আতার সংশ্লিষ্টতা মিলেছে বলে দাবি প্রসিকিউশনের। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা ও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়।
গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২৭ অক্টোবর রায় ঘোষণার জন্য ২৯ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়।
এর আগে, ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ অতিরিক্ত প্রমাণাদি দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলায় ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
২০২৫ সালের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। ওই বছরের ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরদিন ৬ অক্টোবর অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের টানা তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ। ক্ষমতার অপব্যবহার, বলয় তৈরি, বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অসংখ্য অভিযোগে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই নেতার রাজনৈতিক জীবনের করুণ পতন ঘটেছে।
জানা যায়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া-৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সদর এলাকার রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হন হানিফ। তার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে আলোচনায় আসে চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার নাম, যিনি একসময় ভেড়ামারায় থাকলেও পরে কুষ্টিয়া শহরের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, হানিফের নাম ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আতা কুষ্টিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। হামলা, মামলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে হানিফের বাড়িটি দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত ছিল। এলাকাটিকে কুষ্টিয়ার মানুষ পিটিআই রোড হিসেবেই চিনতেন। স্থানীয়দের দাবি, হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর এলাকাটি ‘হানিফ নগর’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যদিও এলাকাটির আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের সরকারি নথি পাওয়া যায়নি, স্থানীয় পরিচিতি হিসেবে নামটি আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন এই এলাকায় বসবাস করছি। আগে এলাকাটি পিটিআই রোড নামেই পরিচিত ছিল। পরে হানিফের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে হানিফ নগর নামটি প্রচলিত হয়। তার রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস পেত না।
এদিকে হানিফের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে তার কথিত চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতারও দ্রুত উত্থান ঘটে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, হানিফের নাম ভাঙিয়ে আতা সদর উপজেলা ও শহরের রাজনীতিতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগের ভেতরে বিরোধী মতের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদেরও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা, হামলা-মামলা এবং হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
মাহবুব উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান আতা কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সময় আতারও কুষ্টিয়া শহর ও সদর উপজেলা রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত হয়। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল।
২০২২ সালে দুদকের অনুসন্ধানে আতার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বালুমহাল ও হাটবাজার ইজারার মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসে।
পরবর্তী ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আতা ও তার স্ত্রী সাম্মিয়ারা পারভীনের বিরুদ্ধে ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৪ টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক মামলা করে। ওই মামলায় স্ত্রীর সম্পদ অর্জনে আতার সহায়তার অভিযোগও আনা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আতার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, তিনি ১০ কোটি ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখেছেন। দুদকের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশের পর নির্ধারিত সময়ে সম্পদের হিসাব জমা না দেওয়ার বিষয়টিও মামলায় উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
মাহবুব উল আলম হানিফের রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি তার সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। সংস্থাটির অভিযোগ, হানিফ ২৭ কোটি ৩৯ লাখ ২৯ হাজার ৩১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ১৮টি ব্যাংক হিসাবে ৮৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯৭ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
একই সময়ে তার স্ত্রীকে ঘিরেও পৃথক অভিযোগ আনে দুদক। স্ত্রীর নামে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ১৬টি ব্যাংক হিসাবে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৬০৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে হানিফ ও তার স্ত্রীর ৪০টি ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা জব্দের আদেশ হয়। তবে ব্যাংক হিসাবের জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে যে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য এসেছে, তা সরাসরি আত্মসাৎ বা অবৈধ সম্পদের পরিমাণ নয়। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে হানিফের প্রভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলে দাবি করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দলীয় সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে হানিফের প্রভাব ছিল ব্যাপক। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধী মতের নেতাকর্মীদেরও অনেক সময় কোণঠাসা হতে হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা এবং রাজনৈতিক হয়রানির করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষও অনেক সময় প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। তবে এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল বলেন, দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী ও বিরোধী মতের নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষও অনেকসময় ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যেন মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতিতে প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সুজাউদ্দিন বলেন, মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার দাপটে তারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন চালিয়েছে। তারা ভেবেছিল তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে।
মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড রায়ে কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা নাসিমা খাতুন বলেন, রাজনীতি মানুষের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু ক্ষমতার কারণে মানুষ যদি ভয় পায়, মামলা-হামলার আশঙ্কায় কথা বলতে না পারে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই ভালো রাজনীতি নয়। হানিফ ও আতার সময়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমরা শুনেছি এবং দেখেছি। আজকের রায়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার বলেন, মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার মানুষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ তার ক্ষমতার বলয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। আজকের রায়ের মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদী শাসন ও মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির জেলা শাখার সদস্য সচিব সুলতান মারুফ তালহা বলেন, এই রায়ের বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। যারা আসামি, তারা বর্তমানে দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন। সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে এই রায় কার্যকর করলেই আমরা সন্তোষ প্রকাশ করব। এর আগে সন্তোষ প্রকাশ করার মতো কিছু আছে বলে আমরা মনে করি না।
চব্বিশের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার শহীদ ইউসুফ শেখের মেয়ে মোছা সীমা বলেন, সরকারের কাছে আবেদন, তারা যেন ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন। রায় হয়ে আমরা খুব খুশি। যারা দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে পলাতক রয়েছে, তাদেরকে যেন আইনের আওতায় এনে সঠিক শাস্তি দেওয়া হয়।








