দৌলতপুর প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ও পদ্মা নদীর নৌপথ ব্যবহার করে মাদকসহ নানা ধরনের চোরাচালানি পণ্য দেশে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। পরে এসব পণ্য সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বিজিবির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে কুষ্টিয়া সীমান্তে বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের মাদক ও অন্যান্য চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদকদ্রব্যের মূল্য ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৫ টাকা এবং অন্যান্য মালামালের মূল্য ১৮ কোটি ৬২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৫ টাকা। এসব অভিযানে ৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্ত এলাকায় মাদকের সহজলভ্যতা বাড়ায় তরুণদের একটি অংশ এতে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বহিরাগত মোটরসাইকেল আরোহী ও অপরিচিত মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। এতে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
দৌলতপুরের চিলমারী ইউনিয়নের বাংলাবাজার সীমান্ত ও উদয়নগর বিওপি-সংলগ্ন পদ্মা নদীতে তীব্র ভাঙনে সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে সীমান্তের একটি অংশ ভারতের অভ্যন্তরে চলে যাওয়ায় কয়েকটি এলাকায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর টহল কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে উদয়নগর সীমান্তকে মাদক ও চোরাচালানি পণ্য পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে চোরাকারবারিরা।
এ ছাড়া আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ও পশ্চিম ধর্মদহ, প্রাগপুর ইউনিয়নের জামালপুর ও বিলগাতুয়া, রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চল্লিশপাড়া ও ভাগযোতসহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন নৌপথ দিয়েও মাদক ও চোরাচালানি পণ্য দেশে প্রবেশ করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
একটি সূত্রের দাবি, দৌলতপুরে প্রতি মাসে প্রায় শত কোটি টাকার মাদকের লেনদেন হয়। তবে এ দাবির স্বাধীন কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মাদক কারবারিদের প্রধান লক্ষ্য ১৭ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ও যুবকেরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদক কারবারির দাবি, ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ও বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেটের চাহিদা বেশি। আকারে ছোট হওয়ায় এসব মাদক সহজে বহন করা যায়।
তার দাবি, প্রশাসনের নজর এড়াতে সরাসরি বেচাকেনার পরিবর্তে ফোনের মাধ্যমে ‘হোম ডেলিভারি’ ব্যবস্থায় মাদক সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশেষ করে বিকেল ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের মাদকসেবনের প্রবণতা বাড়ে। মাদকের সহজলভ্যতার কারণে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতাও বেড়েছে বলে তাদের দাবি।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন অভিযানে ১৬ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৫ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে মাদক ছাড়া অন্যান্য ১৮ কোটি ৬২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৫ টাকা মূল্যের মালামাল জব্দ করা হয়।
সব মিলিয়ে এসব পণ্যের সিজার মূল্য ৩৪ কোটি ৯৪ লাখ ৭৩ হাজার ৮০০ টাকা ৫০ পয়সা।
জব্দ করা মাদকদ্রব্যের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ২৯৮ বোতল বিদেশি মদ, ১ হাজার ১০৪ বোতল ভারতীয় সিনা অ্যালকোহল, ১৯ লিটার দেশি মদ, ২ হাজার ৭৯২ বোতল ফেনসিডিল, ১৪১ দশমিক ৯৩৩ কেজি গাঁজা, ২৫ হাজার ৬২টি ইয়াবা, ২ দশমিক ৩৭১ কেজি হেরোইন, ১২ বোতল এলএসডি, ১ কেজি আফিম, ২৫০ গ্রাম কোকেন, ২ লাখ ২৪ হাজার ২২৯টি সিপ্রোহেপ্টাডিন ও ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট এবং ৫০ হাজার ৭১৯টি সিলডেনাফিল ট্যাবলেট।
এ ছাড়া জব্দ করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৬১৯ প্যাকেট পাতার বিড়ি, ১ লাখ ১ হাজার ২৩০ প্যাকেট সিগারেট, ৯ লাখ ৫ হাজার সিগারেটের স্ট্যাম্প, সাতটি বিদেশি পিস্তল, চারটি দেশীয় শুটার গান, একটি দেশীয় পিস্তল, ১২টি ম্যাগাজিন, ১৫ রাউন্ড গুলি, ৬০ হাজার এয়ারগানের গুলি, দুটি বোমা, তিনটি ককটেল ও ১৫টি দেশীয় অস্ত্র।
অন্যান্য জব্দ করা পণ্যের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় ডিএপি সার, সিটি গোল্ডের চেইন, মোটরসাইকেল, ভারতীয় কীটনাশক, গ্যামাক্সিন পাউডার, চকলেট বাজি, মোবাইল ফোন ও ডিসপ্লে, কারেন্ট ও চায়না জাল, ডিজেল, অকটেন, কাভার্ড ভ্যান, সিএনজি, ভারতীয় কলমী শাকের বীজ, ক্রিম ও স্প্রে মেশিন।
প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল বলেন, আগের তুলনায় মাদকের বিস্তার বেড়েছে। এখন প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার তরুণ সমাজ। প্রায় প্রতিদিন বিজিবি বিপুল পরিমাণে মাদকসহ চোরাচালানি পণ্য উদ্ধার করছে।
দৌলতপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউল ইসলাম বলেন, মাদক-চোরাচালানের সঙ্গে কারা জড়িত, তা অনেকেই জানেন। এখন প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা।
দৌলতপুর চিলমারীর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, দৌলতপুর উপজেলায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রয়েছে। মাদক ও চোরাচালান বন্ধে সীমন্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি এগুলো রোদকল্পে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
স্থানীয় একটি কলেজের প্রভাষক নাজমুল ইসলাম বলেন, মাদক আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করছে। দৌলতপুরের সাথে ভারতের প্রায় ৫৪ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা থাকায় এখানে মাদক এবং বিভিন্ন ধরনের পণ্য চোরাচালান নিত্য দিনের ঘটনা। সীমান্ত পথে চোরাচালান বন্ধে প্রসাশনের নজর দারির পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতা জরুরি।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন বলেন, মাদকাসক্তরা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি তারা শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা সমাজের জন্য বড় হুমকি। সীমান্তে মাদকের চালন ঠেকাতে প্রয়োজন সমন্বিত অভিযান।
দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান বলেন, এটি রোধে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করছি। আমাদের টহল কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া ৪৭ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ কামাল রনি বলেন, সীমান্তে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি টহল ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত মাদক ও চোরাচালানি বিভিন্ন পণ্য উদ্ধার হচ্ছে।
সর্বশেষ শনিবার দিনগত রাত থেকে রোববার (৪ অক্টোবর) পর্যন্ত কুষ্টিয়া সীমান্তে বিজিবির পৃথক অভিযানে ১৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ভারতীয় মাদক ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
দৌলতপুর উপজেলার পশ্চিম ধর্মদহ বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার ধর্মদহ মাঠে বিজিবির একটি টহল দল অভিযান চালিয়ে মালিকবিহীন অবস্থায় সাত বোতল ভারতীয় মদ ও ৪ হাজার সিপ্রোহেপ্টাডিন ট্যাবলেট উদ্ধার করে। এসব মাদকদ্রব্যের আনুমানিক সিজার মূল্য ১২ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকা।
রোববার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রামকৃষ্ণপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার নিচপাড়া কাঁচা রাস্তা থেকে ১০ বোতল ভারতীয় মদ, ১ হাজার ডেক্সামেথাসন ট্যাবলেট ও ৬৪ প্যাকেট পাতার বিড়ি উদ্ধার করা হয়। এসব মাদকদ্রব্য ও মালামালের আনুমানিক সিজার মূল্য ৩ লাখ ১৮ হাজার ৫২০ টাকা।
পরে সকাল ৯টার দিকে প্রাগপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার প্রাগপুর ফুটবল মাঠের দক্ষিণ পাশের পাকা রাস্তা থেকে ১ কেজি ৯ গ্রাম ভারতীয় গাঁজা ও একটি বাইসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এর আনুমানিক সিজার মূল্য ১১ হাজার ৬৫০ টাকা।








