তদন্তের নামে প্রহসন
নিজস্ব প্রতিবেদক ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ৮নং পাটিকাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া একটি মৃত্যু সনদে গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠার পর তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তের লিখিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। গত ১৮ জুন এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করা হলেও এখনো বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ঝুলে থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অভিযোগকারী পরিবার।
অভিযোগকারী মোঃ মখলেছুর রহমানের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মৃত ওসমান মন্ডলের নামে দেওয়া মৃত্যু সনদে তার মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ১৯৬০ সালের ২২ এপ্রিল। অথচ তাদের কাছে থাকা জমির দলিলসহ বিভিন্ন নথিতে ওসমান মন্ডল ১৯৬২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলে তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ সনদে উল্লেখিত মৃত্যুর তারিখের প্রায় দুই বছর পরও তিনি জীবিত ছিলেন—এমন দাবি করছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এ নিয়ে জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। অভিযোগকারী পরিবারের ভাষ্য, বিতর্কিত মৃত্যু সনদ এবং পরবর্তীতে দেওয়া ওয়ারিশ সনদকে ভিত্তি করে একটি পক্ষ ওই জমির মালিকানা দাবি করছে। এতে দীর্ঘদিনের ভোগদখল নিয়ে তারা আইনি জটিলতার মধ্যে পড়েছেন।
গত ১৮ জুন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে পাটিকাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ রেজভি উজ্জামানের বিরুদ্ধে অসঙ্গত তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যু সনদ দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। একই সঙ্গে ওই সনদ ব্যবহার করে একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হলেও তিন মাসের বেশি সময়েও সেই অনুসন্ধানের লিখিত ফলাফল অভিযোগকারী পরিবারকে দেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় দলিলপত্র ও তথ্য-প্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপরও দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাদের ছেলে মুন্সী শাহীন আহমেদ ওরফে জুয়েল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেন। সে সময় বিতর্কিত মৃত্যু সনদ বাতিলের বিষয়ে ইউএনও মৌখিকভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও দাবি পরিবারের। তবে সেই নির্দেশনার পরও সনদটি বাতিল হয়নি।
অন্যদিকে পাটিকাবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ রেজভি উজ্জামানের বক্তব্য, বিষয়টি এখনো উপজেলা প্রশাসনের তদন্তাধীন। উপজেলা থেকে সনদ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হলে ইউনিয়ন পরিষদ তা বাস্তবায়ন করবে।
চেয়ারম্যান বলেন, দুটো বিষয় আসলে সাংঘর্ষিক। এটা দেখেও আমরা বলতে পারছি না যে তার মৃত্যু সনদে যে সাল দেওয়া রয়েছে সেটি ভুল। উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।
এখানেই প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারী পরিবার বলছে, ইউএনও সনদ বাতিলের বিষয়ে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ চেয়ারম্যানের বক্তব্য, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। ফলে কথিত নির্দেশনা বাস্তবে কার্যকর হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে তা বাস্তবায়িত হয়নি কেন তার কোনো উত্তর মেলেনি।
তদন্তের অগ্রগতি ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আগামীকাল একটি প্রতিবেদন দেওয়া হবে। তবে তিন মাসের বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষ না হওয়ার কারণ, এ সময়ে কি কি নথি যাচাই করা হয়েছে, কারা তদন্ত করেছেন এবং অভিযোগকারীকে কেন লিখিতভাবে অগ্রগতি জানানো হয়নি—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
মৃত্যুর তারিখের পাশাপাশি ওই সনদে সাক্ষীর স্বাক্ষর নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করেছেন মখলেছুর রহমান। তার দাবি, সনদে সাক্ষী হিসেবে তার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও দুই সাক্ষীর স্বাক্ষর নিয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ফলে সনদটি কীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল, কে বা কারা আবেদন করেছিলেন, সাক্ষী হিসেবে কারা ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষরগুলো প্রকৃত কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, নলখোলা কবরস্থান কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানার পর বিতর্কিত মৃত্যু সনদ বাতিলের জন্য ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছিল। আবেদন গ্রহণের পরও সনদটি বাতিল হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে মৃত ওসমান মন্ডলের নামে দেওয়া ওয়ারিশ সনদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী। তার দাবি, ওসমান মন্ডলের দুই মৃত কন্যা রোমেছা খাতুন ও আছিয়া খাতুনকে ওয়ারিশভুক্ত না করেই সনদ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, উত্তরাধিকার নির্ধারণের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল এবং ইউনিয়ন পরিষদের রেকর্ডের সঙ্গে সনদের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছিল কি না।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিতর্কিত মৃত্যু সনদের তথ্যকে ভিত্তি করেই একটি পক্ষ জমির মালিকানা দাবি করে আদালতে মামলা করেছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু একটি সনদের তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে ওয়ারিশ নির্ধারণ, জমির মালিকানা এবং দীর্ঘদিনের ভোগদখলের প্রশ্ন।
চেয়ারম্যান শেখ রেজভি উজ্জামান অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার বক্তব্য, আগে যারা মৃত্যু সনদ নিয়েছিলেন, তারাও সেটিকে সঠিক বলে দাবি করছেন। বর্তমানে ভুল থাকার অভিযোগ ওঠায় উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাননি বলেও জানান তিনি।
অভিযোগকারী পরিবারের দাবি, তদন্তে যদি মৃত্যু সনদের তথ্য সঠিক প্রমাণিত হয়, তাহলে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ওসমান মন্ডল জীবিত থাকার দাবির পক্ষে থাকা দলিলগুলোর ব্যাখ্যাও দিতে হবে। আর যদি নথিতে ভুল বা অসঙ্গতি প্রমাণিত হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী তা সংশোধন বা বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তাদের প্রশ্ন, তিন মাসের বেশি সময় ধরে তদন্তে কি কি নথি যাচাই করা হয়েছে, মৃত্যু সনদের তথ্যের উৎস কি ছিল, সাক্ষীদের স্বাক্ষর পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং ওয়ারিশ সনদ তৈরির সময় উত্তরাধিকারীদের তথ্য কিভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল—এসবের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনো মিলছে না।
অভিযোগকারী পরিবার দ্রুত তদন্ত শেষ করে লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশ, বিতর্কিত মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদের তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তাদের ভাষ্য, একটি মৃত্যু সনদের তথ্য নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ এখন জমির মালিকানা ও আদালতের মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাই দীর্ঘসূত্রতা না বাড়িয়ে নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রশাসনের একটি স্পষ্ট ও লিখিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তিন মাস পার হওয়ার পরও যদি তদন্তের শেষ দেখা না মেলে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে তদন্ত আসলে কোথায় গিয়ে আটকে আছে।









