কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

নানান বিতর্কের পরও বহাল কাঞ্চন মালা

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিসেস কাঞ্চন মালাকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ, মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরও তিনি স্বপদে বহাল রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অশোভন আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি বরাদ্দের সামগ্রী বিতরণে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পরও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে চলা তদন্তের বর্তমান অবস্থাও স্পষ্ট নয়।

 

এর আগে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া সদর উপজেলার একদল ভুক্তভোগী ও সাধারণ নাগরিক কাঞ্চন মালার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত স্মারকলিপি প্রদান করেন তারা।

 

স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অফিসে অনুপস্থিত থাকলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কাঞ্চন মালার কাছে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ প্রায়ই অশোভন আচরণের শিকার হন। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নাগরিকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও সাধারণ পোশাক পরিহিত মানুষকে অবমাননাকর মন্তব্য করার পাশাপাশি তাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগও দেন না।

 

এছাড়া তার বিরুদ্ধে অফিসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং সরকারি বরাদ্দের সেলাই মেশিন ও হুইলচেয়ার আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিতরণের অভিযোগও আনা হয়।

 

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, সরকারি অফিসকক্ষে বসে কাঞ্চন মালা তার স্বামীর এনজিওর প্রচার ও গ্রাহক সংগ্রহের কাজ করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে এর আগেও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তারা। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকেও বিষয়টি তদন্ত করা হয়।

 

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তদন্তের বছর পেরিয়ে গেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং কাঞ্চন মালা এখনও একই পদে দায়িত্ব পালন করায় অভিযোগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

 

মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা তিন দফা দাবি জানান। এর মধ্যে ছিল কাঞ্চন মালার বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, তাকে কুষ্টিয়া থেকে অপসারণ করে একজন যোগ্য ও জনবান্ধব কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া এবং সাধারণ মানুষ যাতে ভয়ভীতি বা হয়রানি ছাড়াই উপজেলা কার্যালয় থেকে সরকারি সেবা নিতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।

 

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মোহাম্মদ মুকবল অভিযোগ করে বলেছিলেন, উপজেলা অফিসে সেবা নিতে গেলে কাঞ্চন মালার অসদাচরণের শিকার হতে হয়। তার আচরণে সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে পড়েন। তিনি দ্রুত অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

 

ভুক্তভোগী সজল জানিয়েছিলেন, মানুষ সরকারি সেবা নিতে উপজেলা অফিসে যায়। কিন্তু কাঞ্চন মালার কারণে সেবার পরিবর্তে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাকে কুষ্টিয়া থেকে অপসারণ করে একজন সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান সজল।

 

অপর ভুক্তভোগী জহির বলেছিলেন, উপজেলা অফিস সাধারণ মানুষের সেবার কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে মানুষ যেন হয়রানি বা অপমানের শিকার না হন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

স্মারকলিপি গ্রহণের পর জেলা প্রশাসকের দপ্তর বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল বলে জানান উপস্থিত নাগরিকরা।

 

এদিকে একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, কাঞ্চন মালার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু হলেও বর্তমানে সেই তদন্তের অগ্রগতি বা চূড়ান্ত ফলাফল সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের অনেকেই অবগত নন। তবে উপজেলা পরিষদের একটি সূত্রের দাবি, তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

 

ফলে একদিকে অভিযোগকারীদের অভিযোগ ও মানববন্ধন, অন্যদিকে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার দাবি—দুই ধরনের বক্তব্য সামনে এসেছে। কিন্তু তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে না আসায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই গেছে।

 

স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগগুলো যদি তদন্তে প্রমাণিত না হয়ে থাকে, তাহলে তদন্তের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হচ্ছে না কেন? আর অভিযোগের কোনো অংশ সত্য প্রমাণিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন? একই সঙ্গে মানববন্ধন ও স্মারকলিপির পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে।

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দপ্তরে সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে কর্মকর্তাদের আচরণ, সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা এবং কোনো অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত—এসবই প্রশাসনিক জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই অভিযোগের সত্যতা থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তদন্তের ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন।

 

তবে কাঞ্চন মালার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। একইভাবে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

 

অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয় হওয়ায় এগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও তদন্তের পরও কাঞ্চন মালা স্বপদে বহাল থাকায় অভিযোগের নিষ্পত্তি ও তদন্তের ফলাফল নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রত্যাশা করছেন ভুক্তভোগীরা।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর