কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান এম এম রেজাউল করিম: বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের বৈদেশিক কূটনীতির উন্মেষ ও পথিকৃৎ

বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে দেশের সার্বভৌমিক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং বৈশ্বিক স্বীকৃতি আদায়ে যে কজন অগ্রণী কূটনীতিক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রদূত এম এম রেজাউল করিম। গড়াই ও পদ্মার প্রাক-সাংস্কৃতিক পলিমাটিতে জন্ম নেওয়া এই প্রথিতযশা কূটনীতিক তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের প্রধান প্রধান রাজধানীতে দেশের প্রথম সারির প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
পাকিস্তান পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে কূটনৈতিক ফ্রন্টে লাল-সবুজের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি যে সাহসিকতা প্রদর্শন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। প্রশাসনিক দক্ষতা, ভূরাজনৈতিক কৌশলগত প্রজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে সুগভীর জ্ঞানের সমন্বয়ে তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে অসামান্য অবদান রাখেন।

শৈশব, পারিবারিক পটভূমি ও কুষ্টিয়ার সামাজিক পরিবেশ

এম এম রেজাউল করিম কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তচর্চা এবং প্রগতিশীল সামাজিক পরিবেশ তাঁর বাল্যকাল থেকেই অনন্য ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
শিক্ষাজীবনে মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখে তিনি তৎকালীন মর্যাদাপূর্ণ সিভিল সার্ভিসে সুযোগ লাভ করেন এবং পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে (PFS) যোগদান করেন। পররাষ্ট্রবিষয়ক উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাঁর পেশাদারি দক্ষতা খুব দ্রুতই তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একজন দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও কূটনৈতিক ফ্রন্টে সাহসিকতা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন এম এম রেজাউল করিম বিদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কূটনৈতিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রবল রাজনৈতিক চাপ, নজরদারি ও ব্যক্তিগত জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের নিশ্চিত পেশাগত ভবিষ্যৎ বাজি রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে সরাসরি অবস্থান গ্রহণ করেন।
  • পাকিস্তানি কূটনৈতিক মিশন ত্যাগ: তিনি প্রথম সারির প্রবাসী বাঙালি কূটনীতিকদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে পাকিস্তানি পররাষ্ট্র সার্ভিস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
  • আন্তর্জাতিক বিশ্বজনমত গঠন: তৎকালীন প্রভাবশালী রাষ্ট্রসমূহ, আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশে পরিচালিত গণহত্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের সাময়িক সরকারের পক্ষে সমর্থন আদায় করেন।
  • কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও মানবিক সাহায্য: প্রবাসী বাঙালি সম্প্রদায়কে সংগঠিত করা এবং যুদ্ধাহত মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য ও রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করতে তিনি নিরলস কাজ করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গঠন ও মিশন পরিচালনা

স্বাধীনতার পর সদ্য জন্ম নেওয়া একটি নতুন রাষ্ট্রকে ভূরাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ানো এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তোলা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এম এম রেজাউল করিম সেই সংকটময় মুহূর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পদ এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশে বাংলাদেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত ও হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য

মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রাটোকল চুক্তি এবং শ্রমবাজার উন্মোচনে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন (OIC) এবং জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (NAM) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশের শক্ত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর মধ্যস্থতা অত্যন্ত ফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়।

বহুপাক্ষিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক ফোরাম

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থায় বাংলাদেশের স্বকীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এম এম রেজাউল করিম জাতীয় স্বার্থকে সর্বদা অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক নদী চুক্তি, সমুদ্রসীমা প্রটোকল প্রণয়ন এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী নাগরিকদের মর্যাদা সুরক্ষায় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে অবদান রাখেন।

কুষ্টিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রদূতের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা

কুষ্টিয়া জেলা যেমন কালজয়ী সাহিত্যিক, বাউল সাধক ও সমাজ সংস্কারকদের জন্ম দিয়েছে, তেমনি জাতীয় প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক নীতিতে এম এম রেজাউল করিমের অবদান কুষ্টিয়ার সেই বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতারই এক বিশ্বজনীন রূপ। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, নীতিবান, রুচিশীল এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী।
পেশাদারি সামরিক ও কূটনৈতিক জীবন শেষেও তিনি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণা করেছেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভিত মজবুত করার পেছনে তাঁর এই ত্যাগ ও অবদান ইতিহাসজুড়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Tags :

ফিচার ডেস্ক, কুষ্টিয়া জিলাইভ

সর্বশেষ খবর