কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ইমো কলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর বাঁচার আকুতি

শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের ঈদগাহপাড়ায় অবস্থিত মাদরাসাতুস-সালেহীন মাদ্রাসায় এক হেফজ শিক্ষার্থীকে টানা কয়েক দিন আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে মাদ্রাসাটির হেফজ বিভাগের শিক্ষক আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, শিক্ষকের মারধরে শিশুটির পিঠজুড়ে বড় বড় আঘাতের দাগ, দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীকে আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত শিক্ষক।

 

স্থানীয়দের ভাষায়, যে শিশুটি কোরআন শিক্ষা নিতে মাদ্রাসায় গিয়েছিল, তার শরীরে এমন নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এমন আচরণ অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হৃদয়বিদারক।

 

জানা গেছে, বেগম সফুরা খাতুন ট্রাস্ট পরিচালিত ওই মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন (১৩), পিতা মো. ফজর আলী, গ্রামের বাড়ি ঈদগাহপাড়া, কুষ্টিয়া সদর। পরিবারের অভিযোগ, মাদ্রাসায় সংঘটিত একটি ঘটনার দায় অন্যায়ভাবে হোসাইনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে অমানবিকভাবে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে।

 

ভুক্তভোগী শিশু হোসাইন জানায়, মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমে কথা-কাটাকাটি এবং পরে মারামারির ঘটনা ঘটে। কিন্তু পুরো ঘটনার দায় এককভাবে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গত রবিবার থেকে টানা তিন দিন তাকে মাদ্রাসায় আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ তার।

 

সে আরও জানায়, নির্যাতনের এক পর্যায়ে রাতে সুযোগ পেয়ে এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় ইমো (IMO) অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়। খবর পেয়ে পরদিন সকালে পরিবারের সদস্যরা মাদ্রাসায় ছুটে আসেন। কিন্তু তখনও তাদের বলা হয়, তাকে কোনো হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে নেওয়া যাবে না; বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। পরে তার মা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।

 

শিশুটির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখেছেন বলে দাবি করেন পরিবারের সদস্যরাও। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিঠে লম্বা লম্বা আঘাতের দাগ, দুই হাতে আঘাতের চিহ্ন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা ও কাটা জখম ছিল। এমন দৃশ্য দেখে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।

 

ভুক্তভোগীর বাবা মোহাম্মদ ফজর আলী বলেন, আমার ছেলে ওই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে। একটি ঘটনার জেরে এক শিক্ষক তাকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করেছেন। খবর পেয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে দেখি, আমার ছেলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও কাটা দাগ রয়েছে। রাতে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে চাইলে আমাদের বাধা দেওয়া হয়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসাতুস-সালেহীন মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক আসাদুজ্জামান বলেন, হোসাইন প্রায়ই সহপাঠীদের খাবার খেয়ে ফেলত। তাকে বারবার সতর্ক করা হলেও তার আচরণে পরিবর্তন আসেনি। অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অভিযোগ করেছে এবং সেও কিছু বিষয় স্বীকার করেছে। তাকে এভাবে মারধর করা আমার উচিত হয়নি। শিক্ষার্থীকে কয়েক দিন আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, হোসাইনের বাড়ি মাদ্রাসার খুব কাছেই। তাকে আটকে রাখার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় মাদ্রাসায় আসা-যাওয়া করেছেন।

 

এদিকে মাদরাসাতুস-সালেহীন মাদ্রাসার এতিমখানার সুপার মোছা. সালমা বলেন, এ বিষয়ে আমরা হুজুরের সঙ্গে কথা বলেছি। যতটা সম্ভব অভিযুক্ত শিক্ষককে এই মাসের মধ্যেই বিদায় করে দেওয়া হবে।

 

ঘটনাটি প্রকাশের পর এলাকাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, শিক্ষা ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত একটি মাদ্রাসায় কীভাবে একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীর সঙ্গে এমন আচরণের অভিযোগ উঠতে পারে।

 

স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, শিক্ষার নামে কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতনের স্থান নেই। একজন শিক্ষক যদি শৃঙ্খলার নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেন, তাহলে তা শুধু একটি শিশুর শরীরেই নয়, তার মানসিক বিকাশেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

তারা আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত উদঘাটন করতে হবে। যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তবে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর কোনো শিশুকে এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর