দুদকের দৃষ্টি আকর্ষণ
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলা ও কুমারখালী উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ ও কুমারখালী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। তাদের দাবি, ঘুষ ও কমিশন দিলে কাজের মেয়াদ বাড়ানো, বিল ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যায়। আর কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে নিয়ম মেনে কাজ করার পরও নানা ধরনের হয়রানি, জরিমানা, কাজ বাতিল এমনকি লাইসেন্স স্থগিতের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন পর্যন্ত একটি অনানুষ্ঠানিক কমিশননির্ভর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন না দিলে অনেক ক্ষেত্রে বিল আটকে রাখা হয়। আবার কমিশন দিতে রাজি না হওয়া ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিধিবিধান প্রয়োগ করা হলেও কমিশন দিতে রাজি ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে একই নিয়ম শিথিল করা হয়। এতে সরকারি উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কুমারখালীর ঠিকাদার মো. আব্দুস সামাদ খান অভিযোগ করেন, কুমারখালীর কয়া ইউনিয়নের ফুলতলা-সুলতানপুর সড়ক ইনি ব্লক দ্বারা নির্মাণকাজ তিনি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে গ্রহণ করেন। তার দাবি, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৮৯ লাখ টাকা এবং চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত কাজ শেষ করার সময় নির্ধারিত ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও তার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামাদ খান বলেন, সিডিউল অনুযায়ী কাজ করার পরও প্রথমে তার বিল দেওয়া হয়নি। পরে ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে কাজটি যথাযথ নিয়মে করার জন্য তাকে চিঠি দেওয়া হয়। চিঠি পাওয়ার পর তিনি কাজ শুরু করেন। এরপর ২০ আগস্ট নির্বাহী প্রকৌশলী বিল দেওয়ার জন্য উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন বলেও দাবি করেন তিনি। কিন্তু পরবর্তীতে ৪ সেপ্টেম্বর কুমারখালী উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে তাকে ২৮ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করলে জরিমানা, লাইসেন্স বাজেয়াপ্তসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয় বলে দাবি তার।
সামাদ খানের অভিযোগ, ২৮ দিনের সময় দেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মধ্যেই তার কাজ বাতিল করে দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, ৩০ শতাংশ কমিশন না দেওয়ার কারণেই কাজটি বাতিল করা হয়েছে। টাকা দাবি ও লেনদেনসংক্রান্ত প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। সামাদ খান বলেন, “আমি কমিশন দিতে রাজি না হওয়ায় আমার কাজ বাতিল করা হয়েছে। অথচ আমি নিয়ম অনুযায়ী কাজ করেছি। কমিশন দিলে কাজটি ঠিক করে দেওয়া হতো বলেও আমাকে বলা হয়েছে।”
অভিযোগকারী এই ঠিকাদার আরও বলেন, কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের চকরগুয়া-সদরপুর-ভাদুরী মোড় এলাকার প্রায় ১ হাজার ৫১০ মিটার সড়কের কাজে ৩ ইঞ্চি এজিংয়ের পরিবর্তে তাকে ৫ ইঞ্চি এজিং করতে বলা হয়েছিল। এতে তার প্রায় ১৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পরে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করায় কয়া ফুলতলা, খোকসার আমজাদনগর বাজার, সদরের ভাঙা, সুলতানপুর, কালোয়া ও বেড়কালোয়ার কয়েকটি কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। প্রায় চার মাস তাকে বিভিন্নভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়নি বলে তার দাবি।
সামাদ খানের ভাষ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত তিনি বিষয়টি মেনে নেন। পরে তার কয়েকটি কাজ পুনরায় চালু করা হয় এবং একটি চলতি বিলও দেওয়া হয়। এরপর ফুলতলা-সুলতানপুর সড়কের কাজের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নথি ও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরযুক্ত কাগজপত্র পাওয়ার পর তিনি কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ১২ জুলাই নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে কাজটি যথাযথ নিয়মে করার জন্য চিঠি দেওয়া হয় এবং তিনি সিডিউল অনুযায়ী কাজ করেন।
পরে ২০ আগস্ট বিল দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও উপজেলা প্রকৌশলী তাকে বিল না দিয়ে আবার ৪ সেপ্টেম্বর ২৮ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ২৮ দিনের সময় দেওয়ার পরও মাত্র ১১ দিনের মাথায় কাজ বাতিল করা হয়। সামাদ খান অভিযোগ করেন, তার কাজ বাতিল করে নতুন বাজেটের মাধ্যমে নতুন টেন্ডার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আবারও কমিশন বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অভিযোগকারী ঠিকাদাররা কুমারখালী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের দাবি, কুষ্টিয়া শহরের কোটপাড়া এলাকায় একটি নার্সিং ট্রেনিং কলেজের পেছনে নাজমুল হকের একটি পাঁচতলা ভবন ও জমি রয়েছে। এ ছাড়া তার কথিত আরও সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানের দাবি করেছেন তারা। এসব সম্পদের বৈধ উৎস ও আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন আব্দুস সামাদ খান। তিনি বলেন, “আমরা কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সরকারি কাজ করি। ভ্যাট-ট্যাক্স, শ্রমিক, নির্মাণসামগ্রী ও অন্যান্য খরচ রয়েছে। সবকিছু বাদ দিয়ে ঠিকাদারদের লাভ খুবই কম। সেখানে ৩০ শতাংশ কমিশন দিতে হলে আমাদের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
ঠিকাদারদের অভিযোগ, নাজমুল হকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহযোগীর বিরুদ্ধেও ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তারা আব্দুর রহমান, আব্দুল হাকিম, রত্না খাতুন, আব্দুল জলিল, আমিরুল (ছোট) ও আমিরুল (বড়) নামে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ ও উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী নাজমুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর একসময় তাদের তাৎক্ষণিক ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ করা হয়েছিল।
পরে ওই আদেশ বাতিল হয়ে তারা আবার নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তাদের বদলি, স্ট্যান্ড রিলিজ কিংবা আদেশ বাতিলের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদের বিরুদ্ধেও পলাতক এক আওয়ামী লীগ নেতার লাইসেন্স ব্যবহার করে সরকারি কাজ করার অভিযোগসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পৃথকভাবে অনুসন্ধান চলছে। এছাড়া কুমারখালী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
একই সঙ্গে তাদের নামে থাকা কথিত বিপুল সম্পদের বৈধ উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। এসব অভিযোগ, মামলা ও সম্পদের তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। অভিযোগের বিষয়ে কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ বলেন, ঠিকাদার মো. আব্দুস সামাদ খান তাদের তালিকাভুক্ত কোনো ঠিকাদার নন। তবে প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা যাচাই করে দেখা হবে। অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে নির্বাহী প্রকৌশলীর ওই বক্তব্যের বিষয়ে আব্দুস সামাদ খান দাবি করেন, প্রকল্পসংক্রান্ত নথি ও তথ্য-প্রমাণে ওই প্রকল্পে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি রয়েছে। তার দাবি, তিনি পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে প্রকল্পটি গ্রহণ করে কাজ পরিচালনা করেছেন। প্রকল্পের টেন্ডার, চুক্তিপত্র, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, বিল ও সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি যাচাই করলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। কুমারখালী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. নাজমুল হকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, এলজিইডির প্রকল্পে বিল ছাড়, কাজের মেয়াদ বৃদ্ধি, কাজ বাতিল, জরিমানা এবং লাইসেন্স স্থগিতের সিদ্ধান্তগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। একই সঙ্গে অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাই করতে দুদকের অনুসন্ধান দাবি করেছেন তারা।








