কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

কুষ্টিয়ার হারিয়ে যাওয়া এক শিল্প-ইতিহাস

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের বুকেই দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সময়ের বিখ্যাত বস্ত্রশিল্পের স্মৃতিচিহ্ন। একসময় যার তৈরি শাড়ি, ধুতি ও সুতা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতীয় উপমহাদেশের নানা প্রান্তে, সেই মোহিনী মিল আজ প্রায় পরিত্যক্ত। অথচ একসময় শুধু কুষ্টিয়া নয়, গোটা পূর্ব বাংলার শিল্প-বাণিজ্যের গর্ব ছিল এই প্রতিষ্ঠান। ইতিহাস, স্থাপত্য আর হারিয়ে যাওয়া শিল্পের গল্প জানতে চাইলে কুষ্টিয়া ভ্রমণে ঘুরে দেখতে পারেন মোহিনী মিলের এলাকা।

 

১৯০৮ সালে মোহিনী মোহন চক্রবর্তীর হাত ধরে মাত্র আটটি তাঁতযন্ত্র নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই মিলের। চাকরি থেকে অবসরের পর নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠানটি। তৎকালীন নদিয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমায় মিল স্থাপনের পেছনে ছিল যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধা। কাছেই ছিল রেলস্টেশন, নদীবন্দর এবং বড়বাজার। ফলে রেল ও নৌপথে সহজেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যেত মিলের তৈরি সুতা ও কাপড়।

 

শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই মোহিনী মিল বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯১০ থেকে ১৯১৮ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড থেকে উন্নত তাঁতযন্ত্র এনে উৎপাদন বাড়ানো হয়। বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠে কারখানা। পূর্ব বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তাঁতিরা এখানে সুতা কিনতে আসতেন। একসময় প্রতিদিন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনের কয়েকটি বগি সংরক্ষিত থাকত মোহিনী মিলের সুতা পরিবহণের জন্য।

 

১৯২০-এর দশকে এই কারখানায় প্রায় তিন হাজার মানুষ কাজ করতেন। তৈরি হতো শাড়ি, ধুতি, বিছানার চাদর, তোয়ালে, চিকিৎসায় ব্যবহৃত গজ ও ব্যান্ডেজসহ নানা ধরনের কাপড়। মোহিনী মিলের তৈরি কাপড়ের চাহিদা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও বার্মাতেও। স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশীয় কাপড়ের চাহিদা মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালনা পর্ষদে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সে সময়ের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি।

 

তবে সাফল্যের পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষও দেখা দেয়। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে চার দফায় ধর্মঘট হয় কারখানায়। সময়ের সঙ্গে নানা সংকট ও মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতায় মিলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। বর্তমানে কারখানার যন্ত্রাংশ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বিশাল জমির কিছু অংশে রয়েছে মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ ও দাতব্য হাসপাতাল।

 

একসময় যে কারখানার সুনাম ছড়িয়েছিল দেশের সীমানা পেরিয়ে, আজ তার অনেকটাই কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবু কুষ্টিয়ার শিল্প-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে মোহিনী মিলের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ থাকলে কুষ্টিয়া শহর ঘোরার তালিকায় এই জায়গাটিও রাখতে পারেন।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর