খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই ফেব্রুয়ারি ২০০০, ৮:৬ পিএম

একদিকে প্রকৃতির অনবদ্য সৌন্দর্য, অন্যদিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানবসভ্যতার প্রকৌশল দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন—হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলা এবং উত্তরঞ্চলের পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি এলাকার সংগমস্থলে পদ্মা নদীর বিশাল বুক চিরে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক রেলসেতুটি। সময়ের বিবর্তনে পদ্মার খরস্রোতা রূপ ও ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস কিছুটা ম্লান হলেও হার্ডিঞ্জ ব্রিজের গৌরব, দৃঢ়তা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমোয়নি। এটি আজও দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ও নির্ভরযোগ্য সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে চলেছে। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশ পর্যন্ত এই সেতুটি আমাদের জাতীয় অর্থনীতি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়েছে।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি ঠিক কোথায় অবস্থিত এবং এর আশপাশের ভূপ্রকৃতি কেমন, তা অনুধাবন করা এর কৌশলগত গুরুত্ব বোঝার জন্য অত্যন্ত জরুরি। পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশি রেলস্টেশনের দক্ষিণ পার্শ্বে এবং কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকার মধ্যে বিস্তৃত। ভৌগোলিক স্থানাঙ্কের দিক থেকে এটি ২৪°০৪′০৪″ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°০১′৪৫″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছে।
পদ্মা নদী এখানে অত্যন্ত প্রশস্ত এবং এর তলদেশের পলিমাটি ও জলপ্রবাহের গতিপ্রকৃতি ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশলীদের কাছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। বর্ষাকালে পদ্মার উদ্দাম রূপ এবং শুষ্ক মৌসুমে নাব্য সংকট—এই দুই বিপরীত পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই সেতুটির মূল অবকাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে। সেতুটির দু’পারের সংযোগস্থল অর্থাৎ পাকশি এবং ভেড়ামারা উভয় এলাকাই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জংশন ও ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ইতিহাস কেবল একটি সেতু নির্মাণের ইতিহাস নয়, এটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে ব্রিটিশ ভারত সরকার বুঝতে পেরেছিল যে আসাম, ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড এবং তৎকালীন উত্তরবঙ্গের সাথে কলকাতার সরাসরি ও দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের কৃষিজাত পণ্য, চা এবং অন্যান্য সম্পদ সহজে সমুদ্রবন্দরে ও রাজধানীতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পদ্মার ওপর একটি স্থায়ী রেলসেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

১৯০৯ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মূল নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, যা ১৯১৫ সালে গিয়ে সম্পূর্ণ হয়। বিশ শতকের শুরুর দিকে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব সত্ত্বেও ব্রিটিশ প্রকৌশলীরা যেভাবে পদ্মার মতো খরস্রোতা নদীর বুকে এই সেতু নির্মাণ করেছিলেন, তা প্রকৌশল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্থাপত্যশৈলী এবং কারিগরি মাপঝোক একে সাধারণ কোনো সেতুর চেয়ে অনেক বেশি উচ্চতায় স্থান দিয়েছে। এর প্রধান কারিগরি বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

দীর্ঘ ছয় বছরের নিরলস প্রচেষ্টা শেষে ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক সেতুটি যান চলাচল তথা ট্রেন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। সেতুটি চালুর সমসাময়িক সময়ে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ (Lord Hardinge)। তাঁর সম্মানে এবং তাঁর নামানুসারেই এই সেতুর দাপ্তরিক নাম রাখা হয় “হার্ডিঞ্জ ব্রিজ”। উদ্বোধনের দিন থেকেই এটি পূর্ব বাংলার সাথে কলকাতার রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করে।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কেবল অর্থনৈতিক বা যোগাযোগের প্রতীক নয়, এটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষীহা ইতিহাস এবং বীরত্বেরও এক নীরব সাক্ষী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই সেতুটিকে সামরিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত। উত্তরবঙ্গ থেকে অস্ত্রশস্ত্র, রসদ এবং সেনা আনা-নেওয়ার জন্য তারা নিয়মিত এই সেতু ব্যবহার করায় এটি মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
বোমা হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি: ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরুর দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক চলাচল প্রতিহত করার জন্য মিত্র বাহিনীর বিমান থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর বিমান আক্রমণ চালানো হয়। এই জোরালো বোমা হামলায় সেতুটির ১২ নম্বর স্প্যানটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে বা ধসে পড়ে পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়া ৯ নম্বর এবং ১৫ নম্বর স্প্যানগুলোও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা: স্প্যান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহ ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দেয় এবং বিজয়ের পথকে ত্বরান্বিত করে।
পুনর্নির্মাণ ও পুনরায় চালু: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্রিটিশ সরকারের বিশেষ প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশসমূহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পুনঃনির্মাণ করা হয়। দীর্ঘ মেরামত কাজ শেষে ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হয়, যা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনের একটি বড় অর্জন ছিল।
২০১৫ সালের ৪ মার্চ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তার গৌরবময় শতবর্ষ পূর্ণ করে। একটি শতাব্দী পার করে এসেও সেতুটি তার কাঠামোগত শক্তি ও উপযোগিতা বিন্দুমাত্র হারায়নি। বর্তমান যুগেও প্রতিদিন শত শত টন পণ্যবাহী মালগাড়ি এবং বহু দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেন এই সেতুর ওপর দিয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে যাতায়াত করছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই শতবর্ষী সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঠামোগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে এর ঐতিহাসিক রূপ অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিক রেল বহরের চাপ সামলানো সম্ভব হয়।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কুষ্টিয়া ও পাবনার সীমান্তবর্তী এই এলাকায় প্রতিদিন শত শত ভ্রমণপিপাসী ও ইতিহাসপ্রেমী ভিড় জমান।
লালন শাহ সেতু (২০০৪): হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঠিক পাশেই (মাত্র কয়েক গজ দূরে) ২০০৪ সালে একটি আধুনিক সড়কসেতু নির্মিত হয়। কুষ্টিয়ার বিশ্ববিখ্যাত বাউল সাধক ফকির লালন শাহের নামানুসারে এই সড়কসেতুর নামকরণ করা হয় “লালন শাহ সেতু”।
যুগল সেতুর রূপ: একই নদীর বুকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা এই দুটি সেতু—একটি শতবর্ষী রেলসেতু (হার্ডিঞ্জ ব্রিজ) এবং অন্যটি আধুনিক সড়কসেতু (লালন শাহ সেতু)—মিলে এক অপূর্ব ও দৃষ্টিনন্দন ল্যান্ডস্কেপ তৈরি করেছে। লাল রঙের শৈল্পিক কারুকার্যে মোড়ানো হার্ডিঞ্জ ব্রিজের স্থাপত্যশৈলী যেকোনো পর্যটকের মন কেড়ে নেয়।
নৌভ্রমণ ও সূর্যাস্ত: পর্যটকরা সাধারণত পাকশি বা ভেড়ামারা প্রান্ত থেকে ছোট নৌকায় চড়ে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়ান এবং দুই সেতুর অনন্য স্থাপত্য একসঙ্গে উপভোগ করেন। বিশেষ করে গোধূলি লগ্নে বা সূর্যাস্তের সময় পদ্মার পানিতে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ছায়া পড়ার দৃশ্য এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করে।
হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সম্পর্কে একনজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ নিচে একটি কাঠামোগত টেবিলে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | তথ্য |
| অফিসিয়াল নাম | হার্ডিঞ্জ ব্রিজ (Hardinge Bridge) |
| অবস্থান | পাকশি (পাবনা) থেকে ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া), বাংলাদেশ |
| নদীর নাম | পদ্মা নদী |
| প্রধান ব্যবহার | ব্রড-গেজ রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল |
| মোট দৈর্ঘ্য | ১,৭৯৮.৩২ মিটার (প্রায় ৫,৮৯৪ ফুট বা ১.৮ কিলোমিটার) |
| স্প্যানের সংখ্যা | ১৫টি স্প্যান (প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১২০ মিটার) |
| নির্মাণকাজ শুরু | ১৯০৯-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ |
| উদ্বোধনের তারিখ | ৪ মার্চ ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ |
| নকশাকার ও প্রকৌশলী | স্যার আলেকজান্ডার মেয়াডোস রেন্ডেল ও স্যার রবার্ট গেইলস |
| নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান | বৃথওয়ায়েট ও কির্ক (Braithwaite & Kirk) |
| নির্মাণ ব্যয় | ৩ কোটি ৫১ লাখ ৩২ হাজার ১৬৪ ভারতীয় রুপি |
| শ্রমিক সংখ্যা | প্রায় ২৪,৪০০ জন |
| মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতি | ১৯৭১ সালে ১২ নম্বর স্প্যান ধ্বংস এবং ৯ ও ১৫ নম্বর স্প্যান ক্ষতিগ্রস্ত |
| পুনরায় চালু | ১২ অক্টোবর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ |
| শতবর্ষ পূর্তি | ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ |
| রক্ষণাবেক্ষণ | বাংলাদেশ রেলওয়ে |

প্রশ্ন ১: হার্ডিঞ্জ ব্রিজ কোন নদীর ওপর অবস্থিত এবং এটি কোন দুটি জেলাকে সংযুক্ত করেছে?
উত্তর: হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পদ্মা নদীর ওপর অবস্থিত এবং এটি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলাকে কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার সাথে সংযুক্ত করেছে।
প্রশ্ন ২: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নামকরণ কার নামানুসারে করা হয়েছে?
উত্তর: ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নামানুসারে এই সেতুর নামকরণ করা হয়েছে।
প্রশ্ন ৩: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মোট দৈর্ঘ্য কত এবং এতে কয়টি স্প্যান রয়েছে?
উত্তর: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মোট দৈর্ঘ্য ১,৭৯৮.৩২ মিটার (প্রায় ১.৮ কিলোমিটার) এবং এতে ১২০ মিটার দীর্ঘ মোট ১৫টি স্প্যান রয়েছে।
প্রশ্ন ৪: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কী ধরনের ক্ষতি হয়েছিল?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমান হামলায় সেতুটির ১২ নম্বর স্প্যানটি সম্পূর্ণ ভেঙে নদীতে পড়ে যায় এবং ৯ ও ১৫ নম্বর স্প্যান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মেরামত করা হয়।
প্রশ্ন ৫: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঠিক পাশেই কোন সড়কসেতুটি অবস্থিত?
উত্তর: হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঠিক পাশেই ২০০৪ সালে ‘লালন শাহ সেতু’ নামক একটি আধুনিক সড়কসেতু নির্মিত হয়েছে।
মন্তব্য