কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

শ্মশানে পিকনিক, চিতা ও সমাধিতে জুতা পায়ে ছবি

রাতেই মীমাংসা

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে বসে একদল যুবকের মাংস রান্না করে পিকনিক করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে শ্মশানের চিতার ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তোলা এবং মৃত ব্যক্তির সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত প্রায় ২০ ঘণ্টা ধরে ‘অনিক হোসেন’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ভিডিওতে কয়েকজন যুবককে শ্মশান এলাকায় বসে মাংস রান্না ও খাওয়ার দৃশ্য দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে শ্মশানের চিতার ওপর এবং একটি সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে কয়েকজনকে ছবি তুলতে দেখা গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের হরিনারায়ণপুর বাজার মহাশ্মশানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে থাকা কয়েকজনকে স্থানীয়ভাবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের বাড়ি হরিনারায়ণপুর ইউনিয়নের আব্দালপুর ও শান্তিডাঙ্গা এলাকায় বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে শ্মশান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মৃত স্বজনদের শেষকৃত্য ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িত একটি পবিত্র স্থান। ফলে সেখানে পিকনিকের আয়োজন এবং চিতা বা সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলেন, কোনো ধর্মের পবিত্র স্থানেই এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। এটি কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিরোধ তৈরির বিষয় নয়; বরং প্রত্যেক ধর্মের পবিত্র স্থান ও ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো সবার দায়িত্ব। তারা বলেন, ঘটনাটি নিয়ে কেউ যেন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।

তাদের আরও বক্তব্য, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের দায় পুরো কোনো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো উচিত নয়। বরং ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও ওই মহাশ্মশানে সমাধি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। তবে তখন জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাদের দাবি। এছাড়া আগেও শ্মশান এলাকায় মাংসের হাড়গোড় ও রান্না করার আলামত পাওয়া গেলেও জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে স্থানীয় কয়েকজন জানিয়েছেন।

এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে বিষয়টি নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় রাতেই বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে বলে একাধিক স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। স্থানীয় সূত্র আরও জানায়, ঘটনার পর মীমাংসার সময় ইবি থানার অফিসার ইনচার্জ এস.এম. মামুনুর রশীদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তবে এ তথ্য অস্বীকার করে ওসি এস.এম. মামুনুর রশীদ বলেন, “আমরা শ্মশান কমিটির নেতাদের থানায় আসতে বলেছি। তারা আসলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”

ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি মীমাংসার কথা বলা হলেও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ এখনও রয়েছে। পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করে ভিডিও, ছবি, প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করতে পারে। সূত্রগুলোর দাবি, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা শ্মশানটির দেখভাল ও বিষয়টি নজরদারির দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার বিষয়টি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হলে তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পরে ইবি থানা পুলিশও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকার বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। এটা খুবই দুঃখজনক। ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতা রক্ষা আমাদের সকলেরই দায়িত্ব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি পূজা উদযাপন ফ্রন্ট নেতা তাপস কুমার সাহা দেখভাল করছেন বলেও জানান তিনি। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও হরিনারায়ণপুরের বাসিন্দা তাপস কুমার সাহা বলেন, একটা ঘটনা ঘটেছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সেটা সমাধানের রাস্তা এলাকার জনগণ খুঁজে নিয়েছে। আমাদের শ্মশান এলাকার জনগণ পাহারা দেবে।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এটা বলতে পারবেন। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ঘটনা। আইনগতভাবেও ঘটনাটি তদন্তের দাবি রাখে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ২৯৭ ধারায়, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ধর্মকে অপমান করার উদ্দেশ্য/জ্ঞান থাকা অবস্থায় শ্মশান বা মৃতদেহের অবশেষ রাখার স্থানে অনধিকার প্রবেশ, মৃতদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণ বা শেষকৃত্যে বিঘ্ন ঘটানোর মতো কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে কোনো শ্রেণির মানুষের ধর্মকে অপমান করার উদ্দেশ্যে উপাসনালয় বা পবিত্র বস্তু ধ্বংস, ক্ষতিগ্রস্ত বা অপবিত্র করার ঘটনা ঘটলে দণ্ডবিধির ২৯৫ ধারার বিষয়টিও তদন্তে বিবেচনায় আসতে পারে। তবে এ ঘটনায় কোন ধারা প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তে পাওয়া প্রকৃত ঘটনা, উদ্দেশ্য ও প্রমাণের ওপর। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে কি না—এ নিয়েও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফৌজদারি কার্যবিধিতে ‘কগনিজেবল’ বা আমলযোগ্য অপরাধ বলতে এমন অপরাধকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে আইনের নির্ধারিত শর্তে পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারে। 

কোনো ঘটনায় পুলিশ আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার উপাদান পেলে পুলিশি রিপোর্টের মাধ্যমে মামলা ও তদন্তের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারে। তাই কেবল স্থানীয় পর্যায়ে ‘মীমাংসা’ হয়েছে বলেই সম্ভাব্য ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। ঘটনার প্রকৃতি ও প্রযোজ্য ধারার ভিত্তিতে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বক্তব্য, তারা কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা চান না। তাদের প্রত্যাশা—ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং ভবিষ্যতে কুষ্টিয়ার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক ধর্মীয় শ্রদ্ধার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে- ধর্ম যার যার, কিন্তু প্রত্যেকের ধর্মীয় অনুভূতি ও পবিত্র স্থানকে সম্মান করা সবার দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যেন সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি না হয়, পাশাপাশি কোনো ধর্মীয় স্থানেও যেন অবমাননাকর কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে—এ জন্য আইনগত ব্যবস্থা ও সামাজিক সচেতনতা দুটিই প্রয়োজন।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর