বছর না ঘুরতেই দুরবস্থা-বাধ্য হয়ে সেবা নিচ্ছেন রোগীরা
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের স্বপ্নে নির্মিত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেন এখন ভোগান্তির অপর নাম। পাঁচশ শয্যার এই আধুনিক হাসপাতালের বহিরঙ্গ সুন্দর হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে হাসপাতালের ৬ষ্ঠ তলায় তীব্র নোংরা, দুর্গন্ধ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের মধ্য দিয়েই রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিতে হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার আশায় এসে উল্টো বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশন ও নতুন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন ভর্তি থাকা সাধারণ রোগীরা।
সরেজমিনে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ডের মেঝে, করিডর ও বিভিন্ন স্থানে ডাবের খোসা, পলিথিনসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা জমে রয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে এসব বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে শৌচাগারগুলোর অবস্থা নিয়ে অভিযোগ বেশি। কয়েকটি শৌচাগার অপরিচ্ছন্ন, বেসিন ও ড্রেনে জমে রয়েছে ময়লা পানি। পর্যাপ্ত পানির অভাব ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা।
রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, এখানে চিকিৎসা নিতে আসাটাই এখন এক বড় শাস্তিতে পরিণত হয়েছে। ৬ষ্ঠ তলায় ভর্তি থাকা এক রোগীর স্বজন বলেন, “হাসপাতাল দেখতে নতুন ও সুন্দর হলেও ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত বাজে। বিশেষ করে ৬ষ্ঠ তলার বাথরুমগুলোতে ঢোকা যায় না। বার বার নার্স বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বলা হলেও কেউ কোনো তোয়াক্কা করে না। দিনে একবারও ঠিকমতো ঝাড়ু দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে আমাদের রোগী নিয়ে এই নোংরা পরিবেশেই দিন কাটাতে হচ্ছে।”
আরেক ভর্তি থাকা রোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে এসেছি, কিন্তু যে নোংরা পরিবেশ, তাতে নতুন করে ডায়রিয়া বা ইনফেকশনে আক্রান্ত হওয়ার ভয় কাজ করছে। ৬ষ্ঠ তলায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসে না বললেই চলে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর মতে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম এবং যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের ওপর সঠিক তদারকির অভাব রয়েছে। প্রতিদিন কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে শত শত রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে ৬ষ্ঠ তলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকলেও সেই অনুপাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে হাসপাতালের এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আকুল উদ্দিনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “লোকবল কিছুটা কম থাকায় মাঝে মাঝে পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যাঘাত ঘটে। তবে ৬ষ্ঠ তলার এই অব্যবস্থার বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। দ্রুতই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বিষয়টি তদারকি করা হবে এবং রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ভুক্তভোগী রোগী ও তাঁদের স্বজনদের দাবি, প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলাসহ প্রতিটি ওয়ার্ড, করিডর ও শৌচাগারে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগে এই দুর্ভোগের অবসান ঘটবে এবং হাসপাতালটি তার কাঙ্ক্ষিত সেবার পরিবেশ ফিরে পাবে।
সচেতন মহলের মতে, একটি আধুনিক হাসপাতালের মান নির্ধারিত হয় শুধু দৃষ্টিনন্দন ভবন বা শয্যাসংখ্যা দিয়ে নয়; বরং পরিচ্ছন্নতা, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং রোগীবান্ধব পরিবেশের মাধ্যমেও। তাই ষষ্ঠ তলার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিশ্চিত করা এবং দায়িত্ব পালনে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের প্রত্যাশা শুধু ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তাঁরা চান নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশও। অথচ হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং শৌচাগারের অপরিচ্ছন্নতা রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে অসুস্থ ও শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।








