কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

ডেঙ্গুর হটস্পট থানাপাড়া, আতঙ্কে বাসিন্দারা

মশকনিধনে নেই দৃশ্যমান তৎপরতা 

 

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ায় বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। এর মধ্যে কুষ্টিয়া পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের গড়াই নদীতীরবর্তী চর থানাপাড়া ও আবুল কাশেম সড়কসংলগ্ন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, এলাকায় ঘরে ঘরে জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে মানুষ অসুস্থ হচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে শিশুসহ দুজনের মৃত্যুর দাবিও করেছেন তাঁরা। 

 

স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা, নালা-নর্দমার অপরিচ্ছন্নতা এবং কোথাও কোথাও পানি জমে থাকার কারণে মশার উপদ্রব বেড়েছে। সন্ধ্যার পর ঘরে-বাইরে মশার উৎপাত অসহনীয় হয়ে ওঠে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটিতে নিয়মিত মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের দৃশ্যমান তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ তাঁদের। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কের পাশাপাশি পৌর কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা।

 

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোকসানা খাতুন ও তাঁর সন্তান রাইসা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁদের অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে রাজশাহী নেওয়ার পথে রাইসার মৃত্যু হয় বলে স্বজনদের দাবি। একই সময়ে শ্যামলী খাতুন নামে আরও এক নারীর মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, গত কয়েক দিনের মধ্যে এসব মৃত্যুর ঘটনা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। 

 

চর থানাপাড়া ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংক্রমণ বাড়তে থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম কম। তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, আবর্জনা অপসারণ ও নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

 

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালে ৬৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

 

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ৪৪ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৭ জন রোগী ভর্তি হন এবং ২৪ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পান।

 

হাসপাতালের এই পরিসংখ্যান জেলায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির চাপ তুলে ধরছে। তবে চর থানাপাড়া এলাকায় মোট কতজন আক্রান্ত হয়েছেন, কতজন বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং ওই এলাকায় সংক্রমণের প্রকৃত হার কত—তার নির্ভরযোগ্য সমন্বিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা বিপুলসংখ্যক মানুষের আক্রান্ত হওয়ার দাবি করলেও তা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে উঠে আসেনি।

 

চর থানাপাড়ার বাসিন্দা তারেক বলেন, এলাকায় মশার উপদ্রব অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ঘরে-বাইরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ডেঙ্গু রোগী বাড়লেও নিয়মিত ফগিং বা মশকনিধন কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম চালানো দরকার।

 

আবুল কাশেম সড়কের বাসিন্দা ফাতেমা বলেন, এলাকার বিভিন্ন জায়গায় ড্রেন ও নালা অপরিষ্কার হয়ে আছে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি ও ময়লা পানি জমে থাকছে। এসব জায়গা পরিষ্কার করার পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণ করতে হবে। শুধু মশার ওষুধ ছিটিয়ে নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংসেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা জামাল প্রামানিক বলেন, এলাকায় একের পর এক মানুষ জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, আবর্জনা অপসারণ ও মশকনিধন কার্যক্রম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত হওয়ায় এ ধরনের সমন্বয়গত জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে বিষয়টি জানতে পেরেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে নিয়মিত কার্যক্রম চালানো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

কুষ্টিয়া পৌরসভার প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভা আন্তরিকভাবে কাজ করছে। পৌর এলাকার মশার প্রজননস্থলগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হচ্ছে। তবে বাসাবাড়ির ভেতরে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা পৌরসভার পক্ষে সম্ভব নয়। জনসচেতনতা বাড়াতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাইকিং শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।

 

পৌর প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, টায়ার ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার কমানো সম্ভব।

 

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত পর্যায়ে সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পরিকল্পিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমও জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে, সেখানে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

 

বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ ও প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ, নিয়মিত মশকনিধন এবং ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত ও মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণে এলাকাভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারি জোরদার করা হবে।

 

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু জনসচেতনতামূলক প্রচার নয়, মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Are you human? Please solve:Captcha


সর্বশেষ খবর