খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই আগস্ট ২০২৬, ৩:২০ এএম

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুর রেলগেট এলাকার ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচলের সময় হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় এক ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর বহুতল ভবনের দিকে। আশপাশের সাধারণ আবাসিক ভবনগুলোর ভিড়ে এই অট্টালিকাটি যেন নিজস্ব আভিজাত্য নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় এক বিঘা জমির ওপর নির্মিত ভবনটির চারপাশজুড়ে উঁচু সীমানাপ্রাচীর, সুপরিকল্পিত প্রবেশপথ এবং প্রশস্ত খোলা জায়গা প্রথম দেখাতেই জানান দেয় এটি কোনো সাধারণ আবাসিক ভবন নয়। চারতলা বিশিষ্ট ভবনটির প্রতিটি তলায় রয়েছে অর্ধবৃত্তাকার প্রশস্ত বারান্দা, বহুমাত্রিক কর্নিশ, নান্দনিক ছাউনিযুক্ত ছাদ, দৃষ্টিনন্দন স্টেইনলেস স্টিলের অলংকৃত রেলিং এবং শৈল্পিক নকশার পিলার।
একই নকশার ধারাবাহিকতা ভবনটির প্রতিটি স্তরে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা দূর থেকেই ভবনটিকে আলাদা পরিচিতি দেয়। সর্বোচ্চ তলায় নির্মিত সুসজ্জিত রুফটপ কাঠামো, বৃত্তাকার অলংকারযুক্ত ছাদ এবং সমন্বিত স্থাপত্য ভবনটির সৌন্দর্যে যুক্ত করেছে ভিন্ন মাত্রা। সাদা, হালকা ধূসর ও মেরুন রঙের সমন্বিত বাহ্যিক রঙ ভবনটিকে দিয়েছে অভিজাত ও পরিপাটি একটি রূপ। নিচতলার পুরো অংশ বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছে।
সেখানে বর্তমানে একটি এনজিও এবং একটি বেসরকারি চক্ষু হাসপাতাল ভাড়াটিয়া হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ভবনের সামনের অংশে যানবাহন রাখার ব্যবস্থা, প্রশস্ত প্রবেশদ্বার এবং সুরক্ষিত পরিবেশ ভবনটির বাণিজ্যিক গুরুত্বও বাড়িয়েছে। এলাকাবাসীর অনেকেই ভবনটিকে “রাজপ্রাসাদ”, আবার কেউ কেউ “মিনি প্যালেস” নামে ডাকেন। তবে বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে এই অট্টালিকাকে ঘিরেই এখন ঘনীভূত হয়েছে নানা প্রশ্ন। ভবনটির মালিক চুয়াডাঙ্গা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছে কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার কারসাজি এবং আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন সরকারি প্রকৌশলীর চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে এই বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য কতটুকু—সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে। কুষ্টিয়া জেলার সন্তান দেলোয়ার হোসেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সহযোগিতায় পদোন্নতি লাভ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট তিনি চুয়াডাঙ্গা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। সংশ্লিষ্ট একাধিক ঠিকাদার ও বিভাগীয় সূত্রের দাবি, যোগদানের পর থেকেই তিনি একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে কমিশননির্ভর কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সরকারি ক্রয়বিধি উপেক্ষা করে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্র মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার, টেন্ডার ভাগাভাগি এবং কমিশনের বিনিময়ে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সূত্রগুলো আরও জানায়, কুষ্টিয়ায় সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময় থেকেই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে।
পরবর্তীতে সেই অর্থের একটি অংশ দিয়ে হরিশংকরপুর রেলগেট এলাকায় জমি কিনে এই বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় তার ও তার স্ত্রীর নামে প্রায় ছয় কাঠা জমি রয়েছে। পরিবার ব্যবহার করছে নতুন মডেলের একটি দামি ব্যক্তিগত গাড়ি। এছাড়া নিজ এলাকায় গরুর খামার, ধান চাষ এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক বিনিয়োগের তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের পরিমাণ এবং সরকারি চাকরি থেকে অর্জিত আয়ের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে। নোটিশে অভিযোগ করা হয়, দরপত্রের সব শর্ত পূরণ করলেও কমিশন না দেওয়ায় তাদের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। পরে নিয়মবহির্ভূতভাবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়, আইনবহির্ভূতভাবে দরপত্র মূল্যায়ন ও চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। এসব অনিয়ম বাতিল না হলে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে এর আগে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বলেন, দু-একটি টেন্ডারে তার ক্ষমতার প্রয়োগে কিছু অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তবে তিনি দাবি করেন, তার সব সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত এবং তার স্ত্রীর গরুর খামার ও ব্যবসার আয়কর নথি রয়েছে। তবে এই সংবাদ প্রকাশের পূর্বে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে স্থানীয় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দৃশ্যমান সম্পদ ও পরিচিত আয়ের মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, তা তদন্তের দাবি রাখে। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করলে সম্পদের প্রকৃত উৎস, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি.
মন্তব্য