মহাশ্মশানে পিকনিক ও পবিত্রতা নষ্টের ঘটনা
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানে মাংস রান্না করে পিকনিক, চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে বিষয়টি মীমাংসা নিয়ে বিরোধের জেরে শ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহাকে মারধর ও জোর করে মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানের পর এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও স্বাভাবিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকি অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ২৬ সেপ্টেম্বর সকালে হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন আর রশীদের উপস্থিতিতে স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, মহাশ্মশান কমিটি এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মহাশ্মশানের সার্বিক পরিস্থিতি, নিরাপত্তা, পবিত্রতা রক্ষা এবং স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি অটুট রাখার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
পাশাপাশি আগের বৈঠকে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, সে বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হয়। এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে ইউএনও হারুন আর রশীদের মধ্যস্থতায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, মহাশ্মশান কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ধর্মীয় ও পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশানের নিরাপত্তা ও পবিত্রতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রাচীর ও নিরাপদ গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। মহাশ্মশানের পবিত্রতা নষ্টের ঘটনায় জড়িত কিশোর-যুবকদের ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত না হওয়ার বিষয়ে মুচলেকা নেওয়া এবং তাদের অভিভাবকদের সন্তানদের বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকার জন্য সতর্ক করার সিদ্ধান্ত হয়।
এ ছাড়া মহাশ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সংঘটিত অপ্রীতিকর আচরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অভিভাবক সবার উপস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরায় ঘটবে না মর্মে লিখিত মুচলেকা দেবেন বলেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পক্ষকে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
জানা যায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর হরিনারায়ণপুর মহাশ্মানে স্থানীয় ১০ থেকে ১২ জন যুবক মাংস রান্না করে পিকনিক করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে চিতা ও সমাধির ওপর জুতা পায়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার অভিযোগও ওঠে। পরে সংশ্লিষ্টদের কয়েকজনের ফেসবুক আইডিতে ঘটনাসংশ্লিষ্ট ছবি ও ভিডিও প্রকাশ হলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়ার পরও পরদিন লিখিত মীমাংসাপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে নতুন করে বিরোধের সৃষ্টি হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য। মীমাংসাপত্রে আগের রাতে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের স্বাক্ষর না থাকায় শ্মশান কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহা স্বাক্ষর করতে আপত্তি জানান বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মীমাংসাপত্রটি নিয়ে বিপুল কুমার সাহার সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এক অভিযুক্ত যুবকের বাবা বক্করের কথা-কাটাকাটি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বিপুলের অভিযোগ, তিনি অন্যরা আগে স্বাক্ষর করলে পরে স্বাক্ষর করবেন বলে জানান। একপর্যায়ে তাকে ছাতা দিয়ে মারধর করা হয় এবং মীমাংসাপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করা হয়।
বিপুল কুমার সাহা বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, অন্যরা আগে স্বাক্ষর করুক, এরপর আমি স্বাক্ষর করব। এ কথা বলার পরই আমার ওপর হামলা করা হয়।’
পরে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখতে ২৪ সেপ্টেম্বর হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন পরিষদে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন আর রশীদ, মিরপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হক মজুমদার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মামুনুর রশীদ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক হ্যাপি সাহা, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডা. পিকে সাহা, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সোহারাব হোসেনসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
এর ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন আর রশীদ, মিরপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হক মজুমদার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার অফিসার ইনচার্জ এস এম মামুনুর রশীদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কুষ্টিয়া শাখার পরিচালক হ্যাপি সাহা, কেন্দ্রীয় সদস্য তাপস কুমার সরকার, হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকার, সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহা, হরিনারায়ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. রিয়াজ ইসলাম রিয়াজ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান স্বাধীনসহ অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
বৈঠকে মহাশ্মশানের নিরাপত্তা, পবিত্রতা ও সার্বিক পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি অটুট রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার বা উত্তেজনা ছড়ানো থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়। কোনো বিরোধ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে নিজেরা আইন হাতে না নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি সুবাস কর্মকার ও সাধারণ সম্পাদক বিপুল কুমার সাহা জানান, ঘটনার পর বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধান হওয়ায় বর্তমানে হরিনারায়ণপুর মহাশ্মশান ও আশপাশের এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ বিরাজ করছে।
স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বলেন, হরিনারায়ণপুরে হিন্দু-মুসলিম সবাই দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এই সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। তারা সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না বলে আশ্বস্ত করেন।
মিরপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হক মজুমদার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে বা উত্তেজনা ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। সামনে দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে পালনের ক্ষেত্রেও তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হারুন আর রশীদ বলেন, হরিনারায়ণপুর একটি শান্তিপূর্ণ এলাকা। এখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেমিশে বসবাস করেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় এই সম্প্রীতি নষ্ট হতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজবের বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।









