কুষ্টিয়া জিলাইভ | truth alone triumphs

চিকিৎসক সংকটে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল, বন্ধ ৪টি বিভাগ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে চক্ষু, নাক-কান-গলা (ইএনটি), চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ। শয্যা ২৫০টি হলেও প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে ওয়ার্ডে শয্যার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম হাসপাতালটিতে না চলায় চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

 

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের মোট ৭৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩২ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ। নার্সের ২৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত ২৩৩ জন। সব মিলিয়ে হাসপাতালটিতে ৪০৭ জনের জনবল থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ৩০২ জন। চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

 

হাসপাতালে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগী প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে অন্য হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ কেউ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ছুটছেন। আবার চিকিৎসক না থাকার বিষয়টি আগে থেকে জানতে না পেরে অনেকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহের পর ফিরে যাচ্ছেন।

 

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও উপপরিচালক ডা. এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম জানান, আগে হাসপাতালটিতে চক্ষু, নাক-কান-গলা, চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ চালু ছিল। এসব বিভাগে রোগীরা চিকিৎসাসেবা পেতেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকটের কারণে বর্তমানে বিভাগগুলো বন্ধ রয়েছে। আগে এসব বিভাগে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসকদের অনেকে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগ দিয়েছেন, আবার কেউ অবসরে গেছেন।

 

তিনি বলেন, আগে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন কার্যক্রমও এ হাসপাতালে পরিচালিত হতো। মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকেরা এখানে রোগীদের সেবা দিতেন। বর্তমানে মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম নিজস্ব প্রতিষ্ঠানেই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট কাটাতে নতুন করে চিকিৎসক পদায়ন প্রয়োজন।

 

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আরও জানান, নতুন করে অন্তত ২০ জন চিকিৎসক পাওয়া গেলে রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া সহজ হবে। চিকিৎসক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ২০২৭ সালে প্রায় পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্তের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের শূন্য পদগুলো কবে পূরণ হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা যায়নি।

 

হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ জন রোগী ভর্তি হন। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৫ থেকে ২০টি শয্যার ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ জন রোগী চিকিৎসা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে। তাঁদের একটি অংশকে অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

 

অন্যদিকে, বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

 

চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী জনবল ও শয্যা না বাড়ায় চিকিৎসাসেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

 

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম নিয়ে বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল নিয়োগের পাশাপাশি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়বে।

 

বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক রোগীকে রাজশাহী কিংবা ঢাকায় যেতে হয়। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে। এতে রোগী ও স্বজনদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং চিকিৎসা ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

তবে হাসপাতাল দুটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি। চিকিৎসক ও অন্যান্য শূন্য পদে নিয়োগ, বন্ধ বিভাগ চালু এবং শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়গুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

কুষ্টিয়াবাসীর দাবি, বৃহত্তর কুষ্টিয়ার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জনপ্রতিনিধিদের জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসক সংকট নিরসন, বন্ধ বিভাগগুলো চালু এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সাধারণ মানুষ নিজ জেলাতেই উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

 

Tags :

কুষ্টিয়া জেলা নিউজ ডেক্স, কুষ্টিয়া জিলাইভ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বশেষ খবর